মার্কিন বাহিনী গত বছরের শেষের দিকে ক্যারিবীয় সাগরে একের পর এক নৌযান ধ্বংস করছিল। সেই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলেছিল, নৌযানগুলোতে মাদক পাচার হচ্ছিল। প্রতিটি অভিযানে তিন-চারজন নিহত হওয়ার খবর বেশ গর্বের সঙ্গে প্রচার করছিলেন ট্রাম্প। যেন মাদক পাচারকারী হলেই তাকে মাঝসাগরে গুলি করে হত্যা বৈধ হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হত্যাকাণ্ড বিচারবহির্ভূত বলে আখ্যা দিলেও ট্রাম্প সেসব বিবৃতিকে রীতিমতো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।
মাদকের নাম করে ট্রাম্প আসলে চাইছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে। বেশ কিছুদিন থেকে তিনি এটি প্রকাশ্যেই বলে আসছিলেন। ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে সস্ত্রীক নিজের বাসভবন থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এ ঘটনায় বিশ্ব স্তম্ভিত হলেও ট্রাম্প ফুরফুরে মেজাজে নিজের জয়গান প্রচার করছেন। একটি দেশের ভেতরে প্রবেশ করে প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে আসা, এ কেমন হঠকারিতা?
ভেনেজুয়েলা সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে দেশ পরিচালনা করছে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের মিশন ‘সফল’ বলা যায়। ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। এই মিশনের অন্যতম টার্গেট ছিল মার্কিন মুলুকের নাকের ডগায় থাকা সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবা। শাসকের পরিবর্তনের পরপরই ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তেল ছাড়া কিউবার অর্থনীতি এমনিতেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। প্রকৃত চিত্রও সেটিই।
আসল কথা হলো, ট্রাম্পের নজর ছিল ভেনেজুয়েলার তেল ভান্ডারের দিকে। এ ছাড়া চীন সরকার ভেনেজুয়েলায় যে বিনিয়োগ করেছে, সেটিরও রাশ টানা।
অর্থাৎ, বেইজিংকে ট্রাম্প বলে দিতে চান, অনেক হয়েছে আর না। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এবার তোমরা ভাগো। কিন্তু এতসব রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে ট্রাম্প প্রশাসন মাদককে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে মাত্র। তবে এটাও ঠিক, সেই পথে যে মাদক পাচার হয় না, তা নয়। কিন্তু এভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ তো নিছক লোক দেখানো মাত্র।
এরপর ট্রাম্প হাত বাড়িয়েছেন গ্রিনল্যান্ডের দিকে। বিশ্ববাসী যে যা-ই বলুক, তার গ্রিনল্যান্ড চাই। এখানে অজুহাত হিসেবে এসেছে চীন ও রাশিয়ার নাম। দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনের কবল থেকে রক্ষা করতে চান। এই ইস্যুতে খোদ ন্যাটো ভাঙনের মুখে পড়েছে। কিন্তু ট্রাম্প নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। শেষমেশ তিনি বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে এখনই হয়তো বল প্রয়োগ করবেন না, কিন্তু এ নিয়ে সমঝোতা চান এখনই।
ইরানে বেশ কিছু দিন থেকেই টালমাটাল অবস্থা। বিশেষ করে মাসাহ আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ ইরানের কর্তৃত্ববাদী কাঠামোকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
সেই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল আমিনির হিজাব পরা নিয়ে দেশটির নীতি পুলিশের কঠোরতার প্রতিবাদ হিসেবে। এবার ইরান জ্বলছে মুদ্রাস্ফীতির মতো চরম অর্থনৈতিক টানাপড়েন নিয়ে। আর এই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বলছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এর আগে গাজা যুদ্ধের সময় ইসরাইলের দাবি মেটাতে গিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় শক্তিশালী বোমা হামলা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযানের তোড়জোড় চালাচ্ছে। যদিও আপাতত ট্রাম্প সামরিক অভিযান থেকে পিছু হটেছেন, কিন্তু কখন কোন অজুহাত সামনে নিয়ে আসেন, তা বলা মুশকিল।
অতীতেও এমনটিই দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে যখন ইরাক আক্রমণ করে, সেই সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জোর গলায় বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের হাতে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র রয়েছে। তার যুক্তি ছিল অনেকটা এমন- পৃথিবীকে সুরক্ষা দিতে হলে সাদ্দামের হাতে থাকা অস্ত্র ধ্বংস করতে হবে। তা না হলে যেকোনো সময় ‘স্বৈরশাসক সাদ্দাম’ গোটা পৃথিবীকেই জ্বালিয়ে দিতে পারেন। তা হলে করণীয় কী? সামরিক অভিযানই এনে দিতে পারে চূড়ান্ত সাফল্য। তিনি তা-ই করেছিলেন। কিন্তু বুশের আক্রমণের পর বিশ্ববাসী কী দেখেছিল? সাদ্দাম হোসেনের কাছে সে ধরনের কোনো অস্ত্রই নেই। এই বিধ্বংসী অস্ত্র ছাড়াও মার্কিন প্রশাসন আরেকটি ঘুঁটি কাজে লাগিয়েছিল, তা হলো গণতন্ত্র। সাদ্দাম যেহেতু স্বৈরশাসক, কাজেই তাকে সরিয়ে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটিও হলো। সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি কার্যকর হলো। কিন্তু ইরাকে গণতন্ত্র এলো না। কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা? সেটি আজও অধরাই রয়ে গেছে। মাঝখান থেকে হাজারো মানুষ মৃত্যু, বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে আর হাজার বছরের বহু নিদর্শন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাকে আক্রমণের বছর দুয়েক আগে টুইন টাওয়ারে হামলার মতো দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা ঘটে গেছে। গোটা বিশ্বকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ শুরু করেছে। টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা ওয়াশিংটনকে সেই ‘লাইসেন্স’ দিয়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের ধারণা তেমন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কেননা যুক্তরাষ্ট্র তো সন্ত্রাস দমন আর ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করছে! এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করল। দুই দশকের যুদ্ধের পর আফগানিস্তানের দিকে তাকালে কী দেখা যায়? মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীকে গাঁটরি পেটরা নিয়ে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে। আর শাসনভার দিতে হয়েছে সেই তালেবান গোষ্ঠীকেই। অর্থাৎ, এখানেও যুক্তরাষ্ট্রের সবদিক থেকেই পরাজিত হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন কি নিজেদের
এসব পদক্ষেপকে ভুল মনে করে? না, তা মনে করে না।
বরং নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে নতুন নতুন বয়ান হাজির করছে। শুধু ট্রাম্প কেন, বিশ্বব্যাপী আধিপত্যবাদীরা নানা অজুহাতেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। যেমন করোনা মহামারির পরপরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করলেন। সেই যুদ্ধ এখনও চলছে। সেই সময় রুশ প্রশাসন দাবি করেছিল, ইউক্রেন নব্য ইহুদিবাদীরা মাথাচাড়া দিয়েছে। অতএব, তাদের নিধন করতে হবে। আর উপায় হলো একটাই, সামরিক অভিযান।
এত সব হামলা-অভিযানের অন্তরালে আসলে কী থাকে? অপরকে নিয়ন্ত্রণের আকাক্সক্ষা।
বর্তমানে যে বিশ্বব্যবস্থা চলছে, তা মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা। জাতিসংঘ, আধুনিক ইউরোপের রূপ, ন্যাটো, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি- এই সবকিছুই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকলে মনে হয়, সেই ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রাম্প বিশ্বকে সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রের ধারণা, সার্বভৌমত্ব সবকিছুর ভিত্তি নড়বড়ে করে তোলা হচ্ছে। এসবের পরিণতি যে ভালো নয়, তা শতবার পরীক্ষিত। কিন্তু আধিপত্যবাদের রোগ না সারালে এ থেকে পৃথিবীর মুক্তি নেই। এই রোগ যেকোনো পারমাণবিক বোমা থেকেও কম বিধ্বংসী নয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সময়ের আলো
সময়ের আলো/এসকে/