সরকারি
চাকুরেদের এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে জাতীয় বেতন
কমিশন। গত বুধবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পেশ করেছে কমিশন। এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সন্তোষও
প্রকাশ করেছেন। কিন্তু একসঙ্গে সব গ্রেডের বেতন বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ
করেছে পর্যবেক্ষক মহল। আমরাও মনে করি, এই উদ্বেগের যথাযথ কারণ রয়েছে।
প্রস্তাব
অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশের বেশি এবং সর্বোচ্চ প্রথম
পর্যায়ে ১০৫ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ন্যূনতম
২০তম গ্রেডের বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকায়
দাঁড়াবে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১
লাখ ৬০ হাজার টাকা হবে। দেশের অর্থনীতির সার্বিক চিত্র বিবেচনায় এই বৃদ্ধি
রীতিমতো উল্লম্ফন বলেই আমরা মনে করছি। শুধু তাই নয়, এই বৃদ্ধির ফলে বাজারে
যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও সরকারের হাতে নেই;
অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে।
একসঙ্গে সব গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির
যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশ্লেষক মহল। এর অন্যতম কারণ হলো এই বিপুল
পরিমাণ বাড়তি অর্থ জোগানের কোনো স্পষ্ট রাস্তা নেই। বর্তমানে সরকারের
রাজস্ব আয় কম। এর ওপর প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ও হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে
দ্বিগুণের বেশি বেতন বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে
দাঁড়াবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন- ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ
বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল
কাজ হয়েছে।’ সবশেষ ২০১৪ সালে অষ্টম বেতন কমিশন প্রতিবেদনের আলোকে বর্তমান
বেতন কাঠামো চালু রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১২ বছর পর নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাব
করা হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় দীর্ঘদিন পরই বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে
সরকার। কিন্তু বেতন বৃদ্ধির আগে দেশের সার্বিক চিত্রও সরকারকে বিবেচনায়
নিতে হবে।
বিশ্লেষক মহল জানিয়েছে, সুপারিশকৃত বেতন স্কেল বাস্তবায়ন
হলে সরকারে বিপুল পরিমাণ অর্থের ঘাটতি হবে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে এক হয়
ঋণ করতে হবে, তা না হলে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু ব্যয় কমানোর
রাস্তা বেশ সীমিত বলে অভিমত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
আর কদিন পর
জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই বেতন বৃদ্ধির চাপ নিতে হবে
মূলত আগামী নির্বাচিত সরকারকে। এর ওপর দেশের অথর্নীতির অবস্থাও বেশ করুণ।
এমন পরিস্থিতিতে দ্বিগুণের বেশি বেতন বৃদ্ধিকে আমরা কোনোভাবেই যৌক্তিক মনে
করছি না। আমরা মনে করি- নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের আগে দেশের অর্থনৈতিক
পরিস্থিতি আরও যাচাই করা হোক। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে
নিত্যপণ্যের বাজারকে উসকে দেবে। দেশে শুধু সরকারি চাকুরেরাই বসবাস করেন না,
পাশাপাশি বেসরকারি চাকুরে, কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর- কত শত শ্রেণি-পেশার
মানুষের বাস এই সমাজে। সরকারকে মনে রাখতে হবে- নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে
এর বড় মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। কেননা এই হিসাবে সামাজে যারা ধনী
তারা আরও ধনী আর গরিবরা আরও গরিব হয়। এ কারণে আমরা মনে করি- শুধু টাকার
অঙ্কে বেতন বৃদ্ধির চেয়ে সার্বিক অর্থনীতির কাঠামো মজবুত করার নীতি গ্রহণ
করলে সমাজে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। তাই আমরা আশা করব- অতিরিক্ত বেতন
কাঠামো বাস্তবায়নে যে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হবে, তার রাশ টেনে ধরার
পরিকল্পনা সরকারকে আগেই নিতে হবে।
সময়ের আলো/এসকে/