ভাবা যায়—এক জীবনে তিনশতাধিক বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয়, ১৬টি ছবি পরিচালনা, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অগণিত সম্মাননা; আবার একই মানুষ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রথম সভাপতি। ঠিকই ধরেছেন—এই গল্প নায়করাজ রাজ্জাকের।
আজ (২৩ জানুয়ারি) বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী। কৃর্তিমানদের মৃত্যূ নেই- তাই তিনি জীবনের ওপাড়ে থেকেও আমাদের মাঝে আছেন তার কাজে, প্রজ্ঞায়, চলচ্চিত্রে ও স্মৃতিতে।
১৯৬৪ সালের এক তপ্ত দুপুরে ধোঁয়াচ্ছন্ন একটি ট্রেন এসে থামল কমলাপুর স্টেশন। ট্রেন থেকে নামলেন এক যুবক—এক হাতের আঙ্গুল ধরে আছে শিশু বাপ্পা, অন্য পাশে স্ত্রী লক্ষ্মী। পকেটে অল্প ক’টা টাকা, আর বুকপকেটে একখানা চিরকুট—অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একমাত্র সম্বল।
দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতা ছেড়ে আসা সেই যুবক কি জানতেন, এই অচেনা শহরই একদিন তাকে মাথায় তুলে রাখবে। এও জানতেন না, মাসে ত্রিশ টাকার ভাড়ার স্যাঁতসেঁতে ঘর থেকেই শুরু হবে এক মহাকাব্যিক যাত্রা।
এরপর- কাজ নেই, পরিচিত কেউ নেই— আছে শুধু স্বপ্ন। শুরু হলো সহকারী পরিচালক হিসেবে, তারপর ছোট চরিত্রে কাজ—‘ডাক বাবু’, ‘কারবউ’, ‘১৩ নম্বর ফেকুওস্তাগার লেন’। তবুও ধৈর্য হারাননি। অবশেষে নায়ক হিসেবে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ সিনেমায় লখিন্দরের চরিত্রে আত্মপ্রকাশ, আর সেই থেকেই দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী বসতি।
তারপর আর তার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নায়কোচিত তাকানো, অনির্বচনীয় অভিনয় আর কাজের প্রতি সীমাহীন ডেডিকেশন— তাকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন বাঙ্গালীর ‘নায়করাজ’ রাজ্জাক।
তিনি শুধু জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না—ছিলেন নায়কদের নায়ক। ষাটের দশক থেকে বহু দশক পর্যন্ত—রোমান্টিক, সামাজিক, লোককাহিনি, অ্যাকশন—সব ঘরানায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রাজ্জাক। কবরীসহ সময়ের শীর্ষ নায়িকাদের বিপরীতে তিনি সমান বিশ্বাসযোগ্য। এরপর শূন্য হাতে আসা মানুষটি একদিন ঢাকার অভিজাত অঞ্চলে ঘর বাঁধলেন, গড়লেন ‘রাজলক্ষ্মী’ প্রযোজনা।
আজ জন্মদিনে মনে পড়ে—রাজ্জাক মানে কেবল একজন অভিনেতা নন; রাজ্জাক মানে অদম্য সংগ্রাম, শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এক জীবন্ত রূপকথা।
আজ তিনি নেই। তবু নায়করাজ আছেন—পর্দায়, স্মৃতিতে, আর বাঙালির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ে। তিনি আছেন কোটি দর্শকের হৃদয়ের মণিকোঠায়- রাজকীয়, অমলীন আর চিরকালীন।
/এমএইচআর