দাভোসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি পরিষদ) উদ্বোধনে ব্যাপক শোরগোলের মধ্যেই তার প্রশাসন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পেশ করেছে। এর প্রকৃত লক্ষ্য হলো গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
এই রূপরেখাটি অতি উচ্চাভিলাষী। এতে একটি একক ফিলিস্তিনি শাসিত গাজার কথা ভাবা হয়েছে। যা ইসরাইলি কট্টরপন্থীদের উদ্দেশ্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইসরাইলের বর্তমান সরকার জোটের কেউ কেউ গাজার জনগণকে তাড়িয়ে সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এই পরিকল্পনার সাফল্য মূলত নির্ভর করবে ট্রাম্প এবং তার শান্তি পরিষদে ইসরাইলি আপত্তি ও বাধা অতিক্রম করে এটি বাস্তবায়নে কতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকতে পারে তার ওপর। একই সঙ্গে গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করার তদারকিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা যায় কি না তার ওপর।
দাভোসে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থাপিত একটি স্লাইডশোতে গাজার এক ভবিষ্যৎ স্বপ্নপুরী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; যেখানে থাকবে ঝকঝকে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস টাওয়ার, পরিপাটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, আবাসিক এলাকা, এমনকি একটি বিমানবন্দরও। যদিও ইসরাইল সীমান্তের পাশে একটি বাফার জোন তৈরির জন্য গাজার কিছু অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পত্তির অধিকার উপেক্ষা করে একে একটি ‘ফাঁকা স্লট’ হিসেবে ধরা হয়েছে। তবু এটি হামাস ও ইসরাইল-শাসিত দুই খণ্ডে বিভক্তির অবস্থান থেকে সরে আসার একটি পদক্ষেপ।
পরিকল্পনাটিতে আগামী ১০০ দিনের জন্য কিছু অর্জনযোগ্য প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পানি, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, বেকারিসহ মৌলিক অবকাঠামো মেরামত এবং গাজায় পণ্য প্রবেশের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। আগামী সপ্তাহে মিসর ও গাজার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ সীমান্ত পারাপারটি চালুর কথা রয়েছে, যা ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী দখল করার পর প্রথমবারের মতো খুলবে।
কুশনার এই স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যগুলো অর্জনে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ১০০ দিন আমরা কেবল এটি বাস্তবায়নের দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেব। আমরা মানবিক সহায়তা ও আশ্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, পাশাপাশি সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করছি।’
গাজায় এই শান্তি বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব করবেন প্রবীণ বুলগেরীয় ও জাতিসংঘ কূটনীতিক নিকোলে ম্লাদেনভ। তবে দাভোসে উপস্থাপিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকবে নবগঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি)-এর ওপর। এটি মূলত ফিলিস্তিনি নির্দলীয় প্রযুক্তিবিদদের (টেকনোক্র্যাট) একটি প্যানেল, যারা অন্তর্বর্তী সময়ে গাজা শাসন করবে।
এই কমিটির প্রধান তথা ‘চিফ কমিশনার’ আলি শাথ কায়রো থেকে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে দাভোসে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। পাশাপাশি তিনি গাজার জনগণের উদ্দেশেও কথা বলেন, যারা ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় এ পর্যন্ত অনেকটাই উপেক্ষিত ছিল। ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে শাথ বলেন, ‘ধাপে ধাপে, শৃঙ্খলা ও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে আমরা একটি সক্ষম গাজা পুনর্গঠন করব, যা স্বনির্ভর হবে। আমরা একে স্বাধীনতা, সুযোগ ও শান্তির কেন্দ্রে পরিণত করব।’
প্রকৌশলী এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপ-পরিবহন মন্ত্রী আলি শাথ জানান, এনসিএজির লক্ষ্য হলো ‘এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক অস্ত্র’ নীতির অধীনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা এবং গাজার মানুষের জন্য সুযোগ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। প্রশাসনের সরবরাহ করা নথিপত্র অনুযায়ী, ‘এক অস্ত্র’ মানে হলো ভবিষ্যতে গাজায় যেকোনো অস্ত্র রাখার অনুমোদন কেবল একটি কর্তৃপক্ষই (এনসিএজি) দিতে পারবে।
এই শর্তটি একটি বড় বাধা দূর করার চেষ্টা করছে; কারণ বর্তমানে সেখানে একটি ‘আধা-পালিত’ যুদ্ধবিরতি চলছে। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা একমত যে, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনী (যারা এখনও গাজার অর্ধেকের বেশি দখল করে আছে) আর পিছু হটবে না।
খবর পাওয়া গেছে, হামাস নীতিগতভাবে তাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র, যেমন রকেট ও কামান একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে এবং তারা এনসিএজিকে মেনে নিতেও প্রস্তুত। এটি পরীক্ষা করার জন্য এনসিএজিকে একটি ফিলিস্তিনি পুলিশবাহিনী নিয়ে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে, যারা গত কয়েক মাস ধরে জর্ডান ও মিসরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
দাভোসে উপস্থাপিত পরিকল্পনায় বিশেষত ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (আইএসএফ)-এর কোনো উল্লেখ নেই, যা গত বছর ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের একটি মূল অংশ ছিল এবং নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত হয়েছিল।
এই বাহিনী (আইএসএফ) গঠন করা ছিল সমস্যাসংকুল। আরব ও মুসলিম বিশ্বের যেসব দেশ সৈন্য দিতে রাজি হয়েছিল, তাদের কেউই চায় না তাদের সেনারা হামাসের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে সংঘাতে জড়াক। আবার ইসরাইল সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা তুরস্ক বা কাতারের সেনা গ্রহণ করবে না, অন্যদিকে অন্য দেশগুলো জোর দিয়েছিল যেন তুরস্ক ও কাতার এতে যুক্ত থাকে।
মার্কিন পরিকল্পনায় কেবল নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশবাহিনীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারী অস্ত্রশস্ত্র ‘অবিলম্বে নিষ্ক্রিয়’ করা হবে। ব্যক্তিগত অস্ত্রগুলো নিবন্ধিত করা হবে এবং এনসিএজি পুলিশ যখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে, তখন এলাকাভেদে সেগুলোও জমা নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে ‘কেবল এনসিএজি-অনুমোদিত কর্মীরাই অস্ত্র বহন করতে পারবে’।
এই পরিকল্পনার তাৎক্ষণিক পরীক্ষা হবে আগামী সপ্তাহে, যখন রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খোলার কথা। আলি শাথ বলেন, ‘রাফাহ খুলে দেওয়ার অর্থ হলো গাজা আর ভবিষ্যৎ বা বিশ্বের কাছে রুদ্ধ নয়। এটি একটি বাস্তব পদক্ষেপ এবং একটি নতুন দিকের সূচনা।’
যাহোক, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রীসভায় আগামী সপ্তাহে রাফাহ খোলার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। জোটের ভেতর থেকে এই সীমান্ত খোলার ব্যাপারে প্রবল বিরোধ রয়েছে, অন্তত যতক্ষণ না সর্বশেষ নিখোঁজ ইসরাইলি জিম্মি রন গভিলির দেহাবশেষ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে।
তা ছাড়া গাজায় একটি ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অনেক অভ্যন্তরীণ বিরোধ হবে, কারণ ইসরাইলের কট্টরপন্থিরা ওই এলাকা জনশূন্য করে নিজেদের দখলে নিতে চায়। এই পরিকল্পনায় স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ভবিষ্যৎ গাজা একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হবে কি না। তবে এটি একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনের সম্ভাবনাকে উড়িয়েও দেয়নি। আর যদি এটি নাকচ করা হতো, তবে এনসিএজিতে নির্ভরযোগ্য ফিলিস্তিনি সদস্যদের পাওয়া অসম্ভব হতো।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে যুদ্ধবিরতির সীমানা থেকে ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পুরো গাজা থেকে প্রত্যাহার করা হবে। কুশনারের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ অনুযায়ী এই প্রত্যাহার ‘পারস্পরিক সম্মত মানদণ্ডের’ ভিত্তিতে হবে, তবে এর বিস্তারিত কোনো বিবরণ না থাকায় ইসরাইল এটি মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
গাজার জনগণের জন্য, যারা এখনও তাঁবুতে বাস করছেন এবং নিয়মিত ইসরাইলি হামলার মুখে আছেন, তাদের জন্য বৃহস্পতিবারের উপস্থাপনার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিকটি সম্ভবত এটিই যে, ট্রাম্প এখনও মনে করেন তার ব্যক্তিগত সম্মান ও ‘বোর্ড অব পিস’-এর ইমেজ গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে।
অন্য কথায়, এই শান্তি পরিকল্পনাটি এখনও ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের দাপটে সচল রয়েছে, যা অন্তত একটি স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ গাজা গঠনের পথে থাকা বিশাল বাধাগুলো ভেঙে ফেলার সম্ভাবনা রাখে।
দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
ভাষান্তর : যুবা রহমান
এএডি/