প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫৩ এএম
সংগৃহীত ছবিজাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ থেকে ৩২ হাজার ১৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ২ হাজার ২৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে হাজার কোটি টাকার ঘর পার করেছে ৯টি। সেসব প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও চীনের অনুদানে হওয়া হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত প্রকল্প রয়েছে। রোববার প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা যায়, সভায় নতুন ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি সংশোধিত এবং মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে পাঁচটির। ব্যয়ের দিক দিয়ে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী। যেটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। তবে এ টাকার পুরোটিই চীনের অনুদান থেকে আসবে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতায় থাকা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা উন্নয়ন প্রকল্প। ৮ হাজার ৭৩৫ কোটি ৪০ লাখ ৬৯ হাজার টাকার এই প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। তবে প্রকল্পটির মেয়াদকাল শুরু হয় গত বছরের জুলাইয়ে। এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে। যেটিতে ৬ হাজার ৬৯৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য খাতে বড় প্রকল্প হিসেবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সাধারণ হাসপাতাল স্থাপনের অনুমোদন হয়েছে একনেকে। হাসপাতালটির জন্য ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকার পুরোটিই অনুদান থেকে আসবে। এর মেয়াদকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ ছাড়া বড় অঙ্কের অন্য প্রকল্পগুলো হলো- কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন তিনটি আঞ্চলিক ও একটি জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি ২৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি) তৃতীয় সংশোধনে ১ হাজার ২২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং রাঙামাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৬২) প্রশস্তকরণ ও যথাযথমানে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি ২৬ লাখ ১১ হাজার টাকা।
এ ছাড়া অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো- বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ এবং পার্কি পর্যটন সুবিধা উন্নয়ন প্রকল্প। যেগুলোতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২২ কোটি ৪০ লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং ৭১ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা (সংশোধনী ব্যয়)। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘স্যানিটেশনে নারী উদ্যোক্তা’ প্রকল্পে ৮৬ কোটি ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, নৌ-পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ স্থাপনা নির্মাণে ৭০৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জেলা কার্যালয় নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২০ কোটি ২৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এদিকে শিক্ষা ও যুব খাতে ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্পে ৭৩ কোটি ৭৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রকল্পে রয়েছে ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
এ ছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ছয়টি প্রকল্পে রয়েছে যথাক্রমে- পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে (প্রথম অংশ) ৬৭৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম প্রকল্পে ২৭০ কোটি ৬৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পদ্মা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণে (প্রথম অংশ) ৭৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা; তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষাকরণ প্রকল্পে ৭৩৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা; শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে মাঝিরঘাট জিরো পয়েন্ট এলাকা রক্ষায় (প্রথম সংশোধন) ৩৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা; আড়িয়াল বিল এলাকার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে পানি ও ভূমি সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ৩৪০ কোটি ৮৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।
এদিকে, সর্বনিম্ন ব্যয়ে অনুমোদন হওয়া প্রকল্পগুলো হলো- কৃষি মন্ত্রণালয়ের আশুগঞ্জ-পলাশ সবুজ প্রকল্পে ৪৭০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সিলেট টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের দ্বিতীয় সংশোধনে ১৪৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ও সিলেট টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপনের দ্বিতীয় সংশোধনে ১৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে এই দুটি প্রকল্পই চতুর্থবার ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ১০টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে সরকারি কলেজ উন্নয়ন, বিইউপি উন্নয়ন, ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণ এবং সৈয়দপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সভায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ; অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ; পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন; খাদ্য এবং ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার; স্বরাষ্ট্র এবং কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.); বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার; বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
পরে দুপুর আড়াইটায় একনেক সভার বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, এই সময়ে দুটি একনেক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার পরিবর্তে একটি করা হয়েছে। তাই বেশি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
তবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একনেক করার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একনেকের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগেও যখন একবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আমি ছিলাম তখনও নির্বাচনের আগে একনেক সভা করেছিলাম। তবে গত তিন নির্বাচনের আগে কি হয়েছিল তা আমার দেখার বিষয় না।
উপদেষ্টা বলেন, সবসময়ই আমাদের প্রকল্পগুলোতে একটা ধীরগতি লেগে থাকে। এবার সব মন্ত্রণালয়ে আমরা সম্মিলিত চিঠি দেব যে, এ বছরের জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে সেগুলো সম্পন্ন করতে না পারলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে আরেকটি বিষয় হলো যেসব মন্ত্রণালয় তাদের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে তাদেরই যদি বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটিতে কিছুটা সমস্যা আছে। কেননা এর মাধ্যমে কিছু মন্ত্রণালয় বেশি বরাদ্দ পাবে নিয়মিতভাবে; যার ফলে জাতীয় অর্থনীতি উন্নত করা সম্ভব নয়। কিছু মন্ত্রণালয় এর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়বে।
সময়ের আলো/এনএ