সরকারের ঘুম ভাঙবে কবে?

সামিন ইয়াসার

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও রাষ্ট্রে এখনও অবধি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের জনগণ বুকে স্বপ্ন বুনেছিল- ১৭

2026-01-26T05:25:31+00:00
2026-01-26T05:25:31+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সরকারের ঘুম ভাঙবে কবে?
সামিন ইয়াসার
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও রাষ্ট্রে এখনও অবধি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের জনগণ বুকে স্বপ্ন বুনেছিল- ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দমনের পর হয়তো এমন এক রাষ্ট্র উপহার পাবে, যাতে প্রতিষ্ঠিত হবে ইনসাফ ও আইনের সঠিক ব্যবহার। কিন্তু না। তেমন চোখে পড়ার মতো কিছুই হয়নি আপাতদৃষ্টিতে। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রামপুরা এলাকায় সামনের সারিতে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। শুধু তাই নয়- তিনি ছিলেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। অনবরত বিরোধিতা করেছিলেন ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের কিছুসংখ্যক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পীদের, যারা মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদকে বাংলাদেশে নরমালাইজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। 

এতটুকুতেই ক্ষান্ত থাকেননি ওসমান হাদি। তিনি দিনের পর দিন হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও দলের কর্মীদের। তিনি বলেছেন, ‘যদি একবার সংসদে যেতে পারি, তবে বাকি ২৯৯ জন এমপির ঘুম হারাম করে দেব’। অর্থাৎ তিনি কাউকেই পরোয়া করতেন না; বরং তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বাংলাদেশ যেখানে প্রতিষ্ঠা হবে ইনসাফ। যেখানে পা রাখতে পারবে না কোনো অসৎ লোক কিংবা যারা দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে না কখনো। 

ওসমান বিন হাদি মূলত সবার বুকে জায়গা করে নিয়েছিলেন তার স্পষ্টভাষী আচরণ ও সবাইকে ভালোবাসার এক অনন্য গুণের কারণে। তিনি যেমন প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসৎ কর্মীদের সমালোচনা করতেন; ঠিক তেমনিভাবে বুকে জড়িয়ে নিতেন রাস্তার অচেনা কোনো মানুষকে। তিনি এতটাই স্পষ্টভাষী ছিলেন যে, কোনো রাখঢাক না রেখেই ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে বলে যেতেন। তিনি চেয়েছিলেন, বাংলার মানুষের ওপর ভারতীয় আগ্রাসন যেভাবে ভর করেছে তা যেন আর বিস্তার না হয় ভারতীয় আধিপত্যবাদের মাধ্যমে। কিন্তু রাষ্ট্রের কিছু অসৎ চক্র শহিদ বীর ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে বিয়োগের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। জীবিত থাকাকালীন তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন- তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি, বিভিন্ন টকশোতেও তিনি এ কথা বলেছিলেন। কিন্তু সে সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। 

ওসমান হাদির ওপর ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দিনদুপুরে গুলি চালানো হয়। এবং এক সপ্তাহ পর জীবনের মায়া ত্যাগ করে ১৮ ডিসেম্বর তিনি পরপারে চলে যান। তার জানাজায় শরিক হতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়েছিল সেদিন। তার জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা হাদিকে ধারণ করি’। কিন্তু এখনও হাদি হত্যার বিচার হয়নি, প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও। 

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো- ওসমান হাদিকে ফয়সাল করিম মাসুদ প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করার পরও দেশত্যাগ করে কীভাবে- এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে সাধারণ জনগণের মনে। তাই, ইনকিলাব মঞ্চ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানের সচেতন নাগরিকরা হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন বিক্ষোভ মিছিল করেছে সারা দেশে। তবুও বিচার মেলেনি হাদি হত্যার। সুতরাং বলা কিন্তু যেতেই পারে- হাদিকে ‘হত্যাযোগ্য’করা হয়েছে। কেননা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেই তাদের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। 

যেমন- আবরার ফাহাদের খুনিরা এখনও ন্যায্যবিচারের মুখোমুখি হয়নি; ঠিক তেমনই শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচারও এক অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। তাই তো, রাবেয়া ইসলাম সম্পা (হাদির স্ত্রী) তার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে শঙ্কা প্রকাশ করেছেনÑ ‘ওসমান হাদির হত্যার বিচার কি আদৌ হবে?’ 

সরকারপক্ষ হাদি হত্যার বিচার নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং হাদির এমন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু তাদের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছে- এমন সব কথা তাদের মুখে শোনা গেলেও
প্রকৃতপক্ষে কুম্ভীরাশ্রু ছাড়া কিছুই মনে হয় না। কারণ ভারতের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার ফলে আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালে খুন করা হলেও প্রায় ৬ বছর পরও তার খুনিরা যথাযথ বিচারের সম্মুখীন হয়নি। ঠিক একইভাবে ওসমান হাদির খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। 

শহিদ ওসমান হাদি বলেছিলেন, ‘আমাদেরকে যদি গুলি করে মেরে ফেলা হয়, তাদের যেন ধরে বিচার করা হয়। কারণ, বিচার না করা হলে নতুন কেউ জন্মাবে না।’ বিচারহীনতার এতদিন কেটে যাওয়ার পর সত্যিই যেন মনে হয়- রাষ্ট্রের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রকে সেবা করার জন্য নতুন কোনো বিপ্লবী জন্মাবে না। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, যেখানে আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উঁচু করলেই মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়; সেখানে হয়তো কেউ দেশের মঙ্গল নিয়ে আর কেউ  ভাববে না। 

দেশে দিনের পর দিন এত অরাজকতা চলেই যাচ্ছে। এই অরাজকতার কোনো শেষ সীমানা নেই যেন! এখন শুধু মনের কোণে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়- ‘সরকারের ঘুম ভাঙবে কবে’? তবুও, দেশে এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরও আমরা চাই সরকার যেন ওসমান হাদির খুনিদের যথাযথ বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। দেশে যেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তার সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের আধিপত্য কিংবা আগ্রাসন যেন আমাদের দেশে বিস্তার করতে না পারে- এমনটাই কামনা। যদি তা না হয়, তা হলে আমাদের দেশে ‘নতুন কেউ জন্মাবে না।’ 

সময়ের আলো/এনএ 
  বিষয়:   সরকার  ঘুম ভাঙবে 


Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: