এই সপ্তাহের শেষের দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশের উপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বর্তমান ২০ শতাংশ শুল্ক কতটুকু কমানো হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ঢাকার উপর শুল্ক হ্রাসের বিষয়ে আন্তরিক এবং খুব দ্রুত এই বিষয়ে ওয়াশিংটন একটি ঘোষণা দিবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে জানাতে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এমন মন্তব্য করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, দাভোস সম্মেলনের ফাঁকে লুৎফে সিদ্দিকী একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশনার রক্সানা মিনজাতু ও ইয়োজেফ সিকেলাথাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কানাডা, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন লুৎফে সিদ্দিকী।
সিদ্দিকী বলেন, মার্কিন অ-শুল্ক নীতির অনেক উপাদান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর বাণিজ্য বাধা কমাতে আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। শিগগিরই আরও ভালো সিদ্ধান্ত আসবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত বলেন, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) চালুর ফলে আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে ১৯টি সংস্থার অনুমোদনের জন্য ব্যবসায়ীদের একাধিক দফতরে যেতে হতো, এখন সেখানে ঘরে বসেই সব কাজ অনলাইনে করা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব দেখিয়ে তিনি বলেন, গত আড়াই থেকে তিন মাসে এই ব্যবস্থার ফলে প্রায় ১২ লাখ অফিস ভিজিট কমেছে। বর্তমানে এনএসডব্লিউর আওতায় প্রায় ৯০ শতাংশ আবেদন একদিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি হচ্ছে, আর ৭০ শতাংশ অনুমোদন এক ঘণ্টার মধ্যে মিলছে। বর্তমান সরকারের নেওয়া কাঠামোগত সংস্কারের সুফল এরই মধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে এমন সংস্কার রেখে যাওয়া, যা আগামী সরকারগুলোও ব্যবহার করতে পারবে। এ লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন ইনভেস্টমেন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংস্থা প্রধানরা যুক্ত আছেন। আমরা একটি বিস্তারিত অ্যানুয়াল রিপোর্ট তৈরি করেছি। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—কোথায় কী পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কেন এখন আমাদের ব্যবসা পরিবেশ আগের চেয়ে ড্রামাটিক্যালি ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান পেপাল অবশেষে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের বিষয়ে নীতিগতভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এ আগ্রহ বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে। এ তথ্য জানিয়ে বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, পেপাল নিয়ে অনেক বছর ধরেই আলোচনা চলছিল। কিন্তু নানা কারণে তারা আমাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চাচ্ছিল না।
গত বছরের ১ ডিসেম্বরের দিকে কয়েক মাস অনুরোধের পর পেপাল প্রথমবারের মতো একটি সিনিয়র লেভেলের টিম বাংলাদেশে পাঠায়। তাদের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট হেড (সিঙ্গাপুরভিত্তিক), সাউথ এশিয়ার প্রধান (দিল্লিভিত্তিক) এবং আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চার-পাঁচ দিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এ সময় তারা দেশের উদ্যোক্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও আইসিটি খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও তাদের বৈঠক হয়।
‘এবার প্রথম বারেরমতো উচ্চ পর্যায়ে আমার সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে। ইন প্রিন্সিপাল তারা বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে আগ্রহী। তবে আমি খুব সতর্কভাবে বলছি—এটা নিয়ে যেন ভুল হেডলাইন না হয়। পেপাল এখনই আসছে—এমন ধারণা তৈরি করতে তারা নিজেরাই চাচ্ছে না। পেপালের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের নতুন কোনো দেশে কার্যক্রম শুরু করতে হলে দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ওদের নিজেদের মধ্যে ডিবেট হবে, বোর্ডে আলোচনা হবে। এই পুরো প্রসেসটা তারা এখন শুরু করতে যাচ্ছে। আমার ইম্প্রেশন হলো—ওরা ফুললি কনভিন্সড।’
লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক পোটেনশিয়াল আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে এবার তারা সবচেয়ে বেশি কনফিডেন্ট ফিল করেছে আমাদের গভর্ন্যান্স নিয়ে। বিশেষ করে গভর্নরের সঙ্গে এবং প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে কথা বলার পর তারা দেখেছে ব্যাংকিং সেক্টরের পরিস্থিতি আগের মতো নেই, উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। পেপালের পক্ষ থেকে এখন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সময়ের আলো/এসকে/