মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নীতি সুদহার (পলিসি রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের সুদহার কমানোর দাবিতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান উপেক্ষা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ গত মঙ্গলবার জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য মুদ্রানীতির বিবৃতি বা মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট (এমপিএস) অনুমোদন করেছে।
বৃহস্পতিবার নতুন এই মুদ্রানীতি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে সুদহারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়- সেই নীতিগত রেপো রেট ১০ শতাংশেই রাখা হচ্ছে। কারণ আগের নীতিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল তা এখনও অর্জিত হয়নি। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ শতাংশের একটু বেশি হলেও তা এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। এর আগে ঘোষিত মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান বজায় রাখা হবে।
নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রেখে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আগের ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৯ শতাংশে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতিতেও আগের মতোই সংকোচনমুখী নীতির ধারা বজায় রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য ধরে নীতি সুদের হার, ঋণপ্রবাহ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থান নেওয়া হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। বিগত সরকারের সময় টাকা পাচারকারীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে চূড়ান্তভাবে বিক্রি করা হয়নি।
সরকার থেকেও এসব বাজেয়াপ্ত সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা জমা রেখে তা ফেরত পাচ্ছেন না। বরং সম্প্রতি ‘রেজুলেশন স্কিম’-এর মাধ্যমে লোকসানের দায় চাপানো হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর, যা ব্যাংক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতি যদি আবারও খেলাপিদের জন্য নমনীয় ঋণনীতি, বিশেষ সুবিধা বা গোপন প্রণোদনার পথ খুলে দেয়, তবে তা স্থিতিশীলতার বদলে সংকট আরও গভীর করবে।
সুদের হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনা : নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার কিছুটা কমানো বা স্থিতিশীল রাখার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় রয়েছে, যাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে গতি আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাংকগুলো নিজেরাই তারল্য সংকটে ভুগছে। আমানত কমছে, মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। এ অবস্থায় সুদের হার কমালে ঋণ বিতরণ বাড়বে এই ধারণা অনেকটাই তাত্ত্বিক। বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা ফেরানো ছাড়া কোনো মুদ্রানীতি কার্যকর হবে না। আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাতে তারল্য ফেরানো সম্ভব নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় প্রশ্ন : নতুন মুদ্রানীতির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সাহসের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানোর কারণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সঙ্গে মুদ্রানীতি কঠোর দেখালেও বাস্তবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে তা হলে নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আসন্ন মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সূচকে শৃঙ্খলা আনতে পারলেও ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত সংকট সমাধানে এটি একা যথেষ্ট নয়। যদি নতুন নীতি আবারও পুেরানো সমস্যাকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে স্থিতিশীলতার বদলে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এখন সময় অর্ধসমাধান নয়, বরং কঠোর ও ন্যায্য সংস্কারের।
গত বছর থেকে কঠোর মুদ্রানীতি কার্যকর থাকলেও ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেসরকারি খাতে চাহিদা কমে যাওয়ায় ঋণ ও আমানতের সুদহার সামান্য বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে গড় ঋণ সুদহার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে, আর আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের ওপরে।
সুদহার কমানোর দাবিতে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা স্বীকার করলেও এখনই নীতিগত পরিবর্তনের সময় হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অনুভূতির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত- আমিও সুদহার কমাতে চাই। কিন্তু এখনও আমরা নীতিগতভাবে তা করতে পারছি না। মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নেমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে এসেছে এটি অগ্রগতি কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতিকে ৩-৪ শতাংশে নামিয়ে আনা। সেখানে পৌঁছাতে পারলে পলিসি রেট স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
ফরেক্স বাজারে অগ্রগতি : বাজারে স্থিতিশীলতা বাড়াতে ২০২৫ সালের মে মাসে বিনিময় হার আরও নমনীয় করার পথে হাঁটে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে এক ডলারও বিক্রি করেনি; বরং এ সময়ে বাজার থেকে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। আগের কয়েক বছরের তুলনায় এটি মূলত বড় ধরনের পরিবর্তন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, বর্তমানে দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
পাশাপাশি দীর্ঘদিন ঘাটতিতে থাকা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে এখন উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্য। গভর্নর জানান, চলতি বছরের জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর তা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমদানি ও রফতানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভ বৃদ্ধিও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা গত বছরের জুনে ছিল ২৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২২-১২৩ টাকার মধ্যেই স্থিতিশীল রয়েছে।