যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সীমান্ত শক্ত হবে, আর নীতিতে আপসের জায়গা কমবে। সংখ্যার বিচারে এই অবস্থানের কিছু সাফল্য অস্বীকার করা যায় না। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে যা প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি, বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে, ফেডারেল সংস্থাগুলো আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো- রাষ্ট্র কি কেবল সংখ্যায় চলে? রাষ্ট্র চলে নীতি, ন্যায় এবং মানুষের নিরাপত্তাবোধের ওপর। ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো- তথাকথিত ‘গাল্ড কার্ড’ অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস বা নাগরিকত্বের সুযোগ। সমর্থকদের মতে, এতে ধনী বিনিয়োগকারীরা আসবে, অর্থনীতি লাভবান হবে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি তবে যোগ্যতার দেশ না হয়ে সম্পদের ভিত্তিতে প্রবেশাধিকারের বাজারে পরিণত হচ্ছে?
এই বিতর্কের বাস্তব প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে প্রবাসী অভিবাসীদের ওপর, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিসহ অন্য প্রবাসীদের জীবনে। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অবৈধ অভিবাসনের পক্ষে না। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ দরকার। কিন্তু এখন কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও মনে হয় আমাদের সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।’
নিউ জার্সির আইটি পেশাজীবী তানভীর আহমেদ মনে করেন, ‘ট্রাম্প কথা দিয়ে কথা রাখছেন এটা সত্য। কিন্তু যখন শোনা যায় টাকা থাকলে নাগরিকত্ব সহজ, তখন নিয়ম মেনে আসা মানুষের মূল্য কমে যায়।’
টেক্সাসের ডালাসে বসবাসরত নার্স ফারহানা ইয়াসমিনের ভাষায়, ‘আমরা ট্যাক্স দিই, কাজ করি, সমাজের অংশ। অথচ যেভাবে অভিযান দেখানো হয়, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের ভয় কাজ করে।’
মিশিগানের ডেট্রয়েটের তরুণ উদ্যোক্তা সাজিদ খান বলেন, আইন প্রয়োগ হোক, কিন্তু ন্যায্যভাবে। শক্তি দেখানো আর ন্যায়বিচার এক বিষয় নয়।
অভিবাসনের পাশাপাশি বর্তমানে স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে নীরব, কিন্তু গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিবাসীদের একটি বড় অংশ Affordable Care Act (ACA), যা সাধারণভাবে Obamacare নামে পরিচিত,
এর ভর্তুকিনির্ভর স্বাস্থ্যবীমার ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বনিযুক্ত, ছোট ব্যবসায়ী ও স্বল্প আয়ের পরিবার তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামে চিকিৎসাসেবা পেত। ট্রাম্প প্রশাসনের আগের মেয়াদেই এই সংস্থাটিকে দুর্বল করার চেষ্টা দেখা গেছে- ভর্তুকি কমানো, ব্যক্তিগত ম্যান্ডেট বাতিল এবং রাজ্যগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান মেয়াদে সেই নীতিগুলো আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভর্তুকি কমলে প্রিমিয়াম বাড়বে, কভারেজ সংকুচিত হবে এবং বহু প্রবাসী পরিবার বাজারদরের বীমা বহন করতে পারবে না।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় অংশ স্বনিযুক্ত বা পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য নিয়োগকর্তা প্রদত্ত স্বাস্থ্যবীমা নেই। ফলে বীমা হারালে বা ব্যয় বেড়ে গেলে একটি বড় অসুস্থতাই পরিবারকে আর্থিকভাবে ধ্বংসের মুখে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতাই স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে আতঙ্কের মূল, কারণ যা অভিবাসন অভিযানের মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রভাব অনেক বেশি গভীর।
আতঙ্কের মাঝেও আশ্বাস এই ভয়ের আবহে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছেন কমিউনিটি নেতারা। ইমতিয়াজ চৌধুরী, বাংলাদেশি আমেরিকান সোসাইটি অব প্রফেশনালসের (বিএসপি) প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ট্রাম্প আমলকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা এখনও সঠিক প্রক্রিয়ায় ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে আমেরিকায় আসবে, বিশেষ করে স্টুডেন্ট ভিসায় তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দরজা এখনও খোলা আছে। নিয়ম মেনে চললে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্র এখনও শিক্ষা, দক্ষতা ও বৈধ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়। কঠোরতার মূল লক্ষ্য অনিয়ম, সব অভিবাসী নয়। তবু প্রশ্ন থেকে যায় নীতির বাস্তবায়ন কতটা ভারসাম্যপূর্ণ?
এক বছর পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে শাসন করছেন এ কথা স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু সেই শাসনের ভেতরে মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তাবোধ কতটা জায়গা পাচ্ছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই সময়টি তাই এক ভিন্ন রকমের বাস্তবতা নিয়ে হাজির হয়েছে যেখানে বৈধ অভিবাসীদের জন্য অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্যবীমার জন্য, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলছে কঠোর আইস অভিযান। শক্ত রাষ্ট্র গড়া জরুরি কিন্তু শক্ত রাষ্ট্র তখনই টেকে, যখন সে ন্যায়, মানবিকতা এবং নিরাপত্তাবোধ- এই তিনটাকেই সমান গুরুত্ব দেয়।
সব হিসাব-নিকাশের পর এখন একটাই বাস্তবতা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্পের এক বছর শেষ হয়েছে যেখানে সাফল্য ও বিতর্কের সমন্বয়ে। কিন্তু রাজনীতি কোনো এক বছরের গল্প নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশি থেকে শুরু করে গোটা বিশ্ব এখন সবাই তাকিয়ে আছে ট্রাম্প আমলের বাকি তিন বছর কেমন যায়, সেই দিকে। এই সময়ে শক্ত শাসনের সঙ্গে ন্যায়, মানবিকতা ও অন্তর্ভুক্তির ভারসাম্য রাখা যায় কি না সেই পরীক্ষাই নির্ধারণ করবে, এই অধ্যায় ইতিহাসে কীভাবে লেখা হবে।
লেখক : প্রযুক্তিবিদ, যুক্তরাষ্ট্র
সময়ের আলো/কেএইচও