ইরান উপকূলে মার্কিন শক্তিবৃদ্ধি, ২০২৫-এর হামলার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশে উল্লেখযোগ্য হারে নৌ ও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে। পারমাণবিক

2026-01-29T19:30:37+00:00
2026-01-29T19:30:37+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরান উপকূলে মার্কিন শক্তিবৃদ্ধি, ২০২৫-এর হামলার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:৩০ পিএম 
ডিসেম্বর ১১, ২০২৫-এ পরিকল্পিত বন্দরে ভিজিটের জন্য নৌবহর নেভাল বেস প্রবেশকালে হারবার টাগবোটগুলো নিমিটজ-শ্রেণীর বিমানবাহী নৌযান ইউএসএস অ্যাব্রাহাম লিংকনকে নির্দেশনা দিচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশে উল্লেখযোগ্য হারে নৌ ও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যেই আরব সাগরে পৌঁছেছে।

এই মোতায়েন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরানে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট, গণবিক্ষোভ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই সামরিক শক্তি কি কেবল সতর্কবার্তা, নাকি ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে জুন ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো মার্কিন হামলার আগের পরিস্থিতির বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

গত বছরের জুনে কী ঘটেছিল?

২০২৫ সালের জুনে মধ্যপ্রাচ্য এক বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হয় ১২ দিনের সরাসরি সংঘাত। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ায় এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে বড় আকারের সামরিক হামলা চালায়।

২২ জুন রাতে যুক্তরাষ্ট্র চালায় “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার”। এই অভিযানে একযোগে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় একসঙ্গে ৪ হাজার মার্কিন সেনা এবং ১২৫টি যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছিল। 

এ হামলার লক্ষ্য ছিল মূলত—

ফোরডো: পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র

নাতাঞ্জ: ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক স্থাপনা এবং 

ইসফাহান: পারমাণবিক গবেষণা ও অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র

ফোরডো ও নাতাঞ্জে ব্যবহার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা জিবিইউ-৫৭ এমওপি, যা শুধুমাত্র বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান বহন করতে পারে। অন্যদিকে ইসফাহানে সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপ করা হয় একাধিক টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল?

জুন ২০২৫ সালের হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

তখন দেখা যায়—ছয়টি বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান গুয়ামের দিকে পাঠানো হয়, আরব সাগরে একসঙ্গে দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হয় এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আর্লে বার্ক-শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার পাঠানো হয়। 

পরে জানা যায়, এই মোতায়েনের একটি অংশ ছিল বিভ্রান্তিমূলক কৌশল, যাতে হামলার প্রকৃত পরিকল্পনা ও সময় গোপন রাখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বড় সামরিক অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এমনই কৌশল ব্যবহার করে।

এখন কী ধরনের সামরিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে?

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে আবারও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে। এই জাহাজটি এর আগে দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থান করছিল। এখন এটি আরব সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—যা ইরানের উপকূলের তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীও বড় আকারের প্রস্তুতি শুরু করেছে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন কী ধরনের জাহাজ?

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি। এটি কার্যত একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি।

এর বৈশিষ্ট্য—দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩৩ মিটার, এর জনবল আনুমানিক ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ নাবিক ও মেরিন, শক্তির উৎস প্রধানত পারমাণবিক চুল্লি, ফলে বহু বছর জ্বালানি ছাড়াই চলতে পারে এবং গতি ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটারের বেশি। 

এই জাহাজটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে।

স্ট্রাইক গ্রুপে আর কী থাকে?

একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ সাধারণত গঠিত হয়—একাধিক আর্লে বার্ক-শ্রেণীর গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ক্রুজার, একটি আক্রমণকারী সাবমেরিন এবং একটি রসদ ও জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ নিয়ে। ডেস্ট্রয়ারগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আকাশপথে কী ধরনের প্রস্তুতি চলছে?

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে থাকা ক্যারিয়ার এয়ার উইং ৯-এ প্রায় ৬৫টি যুদ্ধবিমান রয়েছে।

এই বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে—এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট, নজরদারি ও গোয়েন্দা বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান। 

একই সময়ে ইউএস এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড ঘোষণা দিয়েছে যে তারা মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার ২০টিরও বেশি দেশে বহুদিবসব্যাপী সামরিক মহড়া চালাবে।

এই মহড়ার লক্ষ্য মূলত দ্রুত যুদ্ধবিমান ও সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা যাচাই, মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনার অনুশীলন, বড় আকারের সংঘাতে সমন্বয় বাড়ানো। 

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের মহড়া সাধারণত বাস্তব অভিযানের আগেই দেখা যায়।


মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক উপস্থিতি কতটা বড়?

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে—বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, ইসরায়েল, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এছাড়া ওমান ও তুরস্কেও মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে।

ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ইরানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে এই আন্দোলন ছিল মুদ্রার অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা সরকার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।

জাতিসংঘের এক বিশেষ দূতের মতে— এ গণবিক্ষোভে অন্তত ৫,০০০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। এই দমন-পীড়ন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিতে কড়া ভাষায় ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, আমাদের একটি বিশাল বহর ওই অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, হয়তো এটি ব্যবহার করতে হবে না। 

তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা চালিয়ে যায়, তাহলে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা জুন ২০২৫ সালের হামলাকেও হার মানাবে। 

তাহলে কি আবার হামলার সম্ভাবনা রয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। কিছু বিশ্লেষকের মতে—যুক্তরাষ্ট্র সীমিত বা প্রতীকী হামলা চালাতে পারে। হামলার উদ্দেশ্য হবে ইরান সরকারকে চাপ দেওয়া। 

আবার অন্যরা বলছে, বিক্ষোভ ইতোমধ্যেই দমন করা হয়েছে এবং সামরিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিও এ হামলার শিকার হবে। 


/ইউএমএইচ



  বিষয়:   ইরান  মার্কিন  হামলা  ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: