ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। হাজারো লোক গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে অনেকের ব্যবসায়ী সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা চলছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে— ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে আপাত শান্ত পরিস্থিতির আড়ালে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সুযোগ পেলেই তারা বিক্ষোভ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন— ইরানের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে— এর একটি হলো কঠোর সব বিধি নিষেধ তুলে দিয়ে অর্থনীতি মেরামত করা আর না হলে আরও বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হওয়া।
তা হলে দেখা যাচ্ছে— বিপর্যস্ত অর্থনীতি, আঞ্চলিক দুর্বল মিত্রদের দুর্বলতা সর্বোপরি মার্কিন হামলার মুখে ইরান এখন ইতিহাসের মহাসন্ধিক্ষণে রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিক গ্রুপের ইরানবিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ‘বর্তমান স্থিতাবস্থা কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না। আমি বলছি না যে, কালকেই এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, তবে এটি পতনের মুখে রয়েছে। সরকার যদি পরিবর্তন মেনে না নেয় তা হলে পরিস্থিতি শুধু অবনতির দিকেই যাবে।’
সাম্প্রতিক বিক্ষোভ গত বছর ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল। সেই সময় দেশটির মুদ্রার চরম দর পতন হয়। রাতারাতি সেই আন্দোলন গোটা ইরান ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দেশটিতে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী আন্দোলনে নিহত হয়েছেন ৩১১৭ জন— যার মধ্যে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। তবে মানবাধিকার কর্মীদের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৪,৫০০ ছাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট
এর আগে ২০১৯ সালের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনি নিহতের জেরে নারী-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পর সরকার সাধারণত ভর্তুকি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়া সামাজিক বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এবার সেই সুযোগ খুব সীমিত।
বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে ইরানি রিয়ালের মান একেবারে তলানিতে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর মুদ্রাস্ফীতি ৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০১৬ সালেও ছিল মাত্র ৬.৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে পারমাণবিক চুক্তির সুবাদে ইরান অর্থনৈতিক স্বস্তি পেয়েছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও তীব্র পানির সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি
নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে ইরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু তার জন্য সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে তার পররাষ্ট্রনীতির তিনটি মূল স্তম্ভ— পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আঞ্চলিক মিত্রদের (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) সমর্থন দেওয়া— নিয়ে আপস করতে হবে।
এই স্তম্ভগুলো ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ বা সম্মুখ প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশÑ যার মূল লক্ষ্য হলো লড়াই যেন ইরানের সীমানার ভেতরে না পৌঁছে। এই নীতির পরিবর্তন করার অর্থ হলো খামেনির তৈরি করা সুরক্ষা নিরাপত্তা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। অতীতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও, মিসাইল বা আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়ে ইরান কখনোই কোনো ছাড় দেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলি শাবানি বলেন, ‘ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করলে পুনরায় বোমাবর্ষণ করা হবে। ফলে খামেনি এখন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন।’
অন্যদিকে ইসরাইলের সঙ্গে গত জুনের যুদ্ধের পর ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ও অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করা হয়েছে, সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে এবং ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছে। ইরানের ভেতরে এখন বিতর্ক চলছে যে এই প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো আসলে কতটা কার্যকর। তবে সরকারিভাবে ইরান এখনও তাদের এই নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের নীতিতেই অটল রয়েছে।
পরিবর্তন কি অনিবার্য?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান কথা বলতে চায় এবং আমরাও কথা বলব।’ তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে, যা মূলত ইরানকে চাপের মুখে রেখে একটি চুক্তিতে বাধ্য করার কৌশলমাত্র।
ইরান যদি শেষ পর্যন্ত কোনো আপস করে তা হলে সরকারের বৈধতা ও নিরাপত্তার ইমেজ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। দশকের পর দশক ধরে ইরানি জনগণের সঙ্গে সরকারের অলিখিত চুক্তি ছিল— নাগরিকরা সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে, বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু গত বছর ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে অন্তত ৬১০ জন ইরানি নিহত হওয়ার পর সেই নিরাপত্তার স্তম্ভটি নড়বড়ে হয়ে গেছে।
বিশ্লেষক আলি রেজা আজিজির অভিমত হলো— ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে একটি রূপান্তর শুরু হয়েছে। দেশটির ক্ষমতা ধীরে ধীরে আলেম সমাজ বা মোল্লাতন্ত্রের হাত থেকে সরে গিয়ে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড ক্রপস’ (ওজএঈ)-এর মতো সামরিক গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে।
আজিজি বলেন, ‘খামেনির মৃত্যু বা অপসারণের পর আমরা বর্তমান চেহারার ইসলামিক রিপাবলিককে আর দেখতে পাব না। সেটি কি জনগণের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, নাকি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেতর থেকে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে— তা সময় বলবে। তবে পরিবর্তন এখন অনিবার্য।’
লেখক : ইতালীয় বংশোদ্ভূত আলজাজিরার সাংবাদিক।
ভাষান্তর : যুবা রহমান
এফআর