একটি দেশের পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি নয়; এটি বিদেশের মাটিতে সেই দেশের সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা এবং নাগরিকের পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সাম্প্রতিক বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির ঘটনা এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে এই সংকটের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি প্রবাসী ও বিদেশগামীদের এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা কেবল একটি অনুরোধ নয়, বরং দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে এক চরম সতর্কতা বা অশনিসংকেত।
বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশের মাটিতে জালিয়াতিতে লিপ্ত হওয়ার সংবাদ নতুন কিছু নয়, তবে এর ব্যাপ্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তিকে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই জালিয়াতি কেবল গুটিকয়েক ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ যা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, শিক্ষা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ভাবমূর্তির সংকট ও সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি পাসপোর্ট বা ভিসা জালিয়াতির সবচেয়ে বড় শিকার হন সেই সব সাধারণ নাগরিক যারা বৈধপথে বিদেশে যেতে চান। যখন কোনো একটি দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে, তখন আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন ও দূতাবাসগুলোতে সেই দেশের প্রতিটি নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আজ একজন বাংলাদেশি ছাত্র বা একজন সৎ রেমিট্যান্স যোদ্ধা যখন বিদেশি বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন তাকে যে বাড়তি তল্লাশি বা অপদস্থ হওয়ার মুখোমুখি হতে হয়, তার মূলে রয়েছে এই জালিয়াত চক্র। একটি সবুজ পাসপোর্টের মর্যাদা রক্ষা করা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব, সেখানে কিছু মানুষের লোভ পুরো জাতিকে লজ্জিত করছে।
শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত আমাদের বিশাল শ্রমবাজার রয়েছে। ভিসা জালিয়াতির কারণে অনেক দেশ এখন বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কঠিন করে দিচ্ছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিসা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তি যখন জাল ভিসা বা ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে ধরা পড়ে, তখন সেই দায় কেবল তার একার থাকে না, বরং পুরো দেশের ওপর ‘অবিশ্বাসের দেয়াল’ তৈরি হয়। এর ফলে যোগ্য ও দক্ষ কর্মীরাও বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিন্ডিকেট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা পাসপোর্ট জালিয়াতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে কাজ করে এক শক্তিশালী ও অসাধু সিন্ডিকেট। দালালের খপ্পরে পড়ে অনেক নিরীহ মানুষ যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি সরকারি দফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি সম্ভব নয়। এটি অনস্বীকার্য সত্য।
পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে কেবল নাগরিক সচেতনতা দিয়ে এই ব্যাধি নিরাময় সম্ভব নয়। ই-পাসপোর্ট বা আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলেও জালিয়াত চক্র নিত্যনতুন উপায় বের করছে, যা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও তৎপর হতে হবে।
শূন্য সহনশীলতা প্রধান উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন যে, এই আত্মঘাতী পথ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। যারা বিদেশের মাটিতে দেশের সম্মান বিক্রি করছে, তাদের কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
দ্বিতীয়ত জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। দালালের মাধ্যমে শর্টকাট পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। তৃতীয়ত পাসপোর্ট ইস্যু করার প্রক্রিয়াকে আরও ত্রুটিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
দেশপ্রেম কেবল মুখের কথা বা জাতীয় সংগীতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একজন নাগরিক যখন দেশের বাইরে যান, তখন তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি পুরো বাংলাদেশের প্রতিনিধি। তার প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ দিয়ে বিচার করা হয় তার রাষ্ট্রকে। ড. ইউনূসের এই সময়োপযোগী আহ্বান যদি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে না নিই, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পাসপোর্ট অচিরেই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় এখনই সময় সম্মিলিতভাবে এই জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
এফআর