সম্প্রীতির মধুময় স্মৃতি মাঘী পূর্ণিমা

শতদল বড়ুয়া

আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। ফাল্গুনের লাল-নীলিমায় প্রকৃতি নবসাজে রূপান্তরের প্রাক্কালে আজকের মঙ্গলময় পুণ্য তিথিতে মহামানব বুদ্ধ নিজের আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ

2026-02-01T04:07:23+00:00
2026-02-01T04:07:23+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সম্প্রীতির মধুময় স্মৃতি মাঘী পূর্ণিমা
শতদল বড়ুয়া
প্রকাশ: রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। ফাল্গুনের লাল-নীলিমায় প্রকৃতি নবসাজে রূপান্তরের প্রাক্কালে আজকের মঙ্গলময় পুণ্য তিথিতে মহামানব বুদ্ধ নিজের আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন। বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দকে বুদ্ধ বললেন, ‘আনন্দ- এ বৈশালী অত্যন্ত মনোরম স্থান।’ 

এখানকার উদ্যান চৈত্য, গৌতম চৈত্য, বহুপুত্রক চৈত্য বড়ই মনোরম ও মনোমুগ্ধকর স্থান। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি যেমন চমৎকার, তেমনি প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদেও এসব এলাকা ভরপুর। বুদ্ধ আবার বললেন, ‘আনন্দ তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল স্বকীয় ঋদ্ধিবলে বর্তমান দেহ অবস্থান করতে পারেন।’ হে আনন্দ, তথাগতের চারি ঋদ্ধি পাদ ভাবিত, বহুলীকৃত রথগতি-সদৃশ অনর্গল অভ্যস্ত, বাস্তুভূমি-সদৃশ, সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিচিত, সম্যকভাবে আপনার করায়ত্ত। আনন্দ, সে জন্য তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল কিংবা কল্পের অবশিষ্ট সময় অবস্থান করতে পারেন।

তথাগত বুদ্ধ কী বোঝাতে চাইলেন আনন্দ তা অনুধাবন করতে পারল না মারের দ্বারা প্রলুব্ধ হওয়ায়। কিন্তু মার বিরামহীনভাবে বুদ্ধকে শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেন- ‘হে সুগত, আপনি পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হোন, আপনার পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হওয়ার এখনই সঠিক সময়। ভগবান মারকে বললেন, হে পাপি মার যতদিন আমার ভিক্ষুসংঘ ত্রিপিটকের বাণীগুলো সুন্দররূপে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, ততদিন পর্যন্ত তথাগত নির্বাণ লাভ করতে পারেন না। মার বলল, ‘ভন্তে ভগবান, আপনার ভিক্ষুসংঘ এখন ধর্ম প্রচারে সিদ্ধহস্ত ও নিপুণ। সুতরাং, ভন্তে ভগবান আপনি নির্বিঘ্নে নির্বাণ লাভ করতে পারেন।’

পাপমতি মারকে ভগবান বললেন, হে পাপিষ্ঠা দুরাচার মার তা হলে শোন, অচিরেই তথাগত পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হবেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তথাগত ভগবান বুদ্ধ তখনকার সময়ে যখন আশি বছর বয়সে পদার্পণ করেন, তখন রাজগৃহের বেলুরবনে পঁয়তাল্লিশ বর্ষা অর্থাৎ অন্তিম বর্ষা অধিষ্ঠান করেছিলেন। তিনি বর্ষাব্রতকালীন কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগে সাধনা দ্বারা রোগমুক্ত হয়েছিলেন। যাকে ছন্দ, বীর্য, চিত্ত মীমাংসা বলা হয়।

ভগবান চাপাল চৈত্যে সেই সময় আজকের মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে স্মৃতিমান ও সচেতন অবস্থায় স্বীয় আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে এই বলে ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে তিন মাস পর বৈশাখী পূর্ণিমা পর্যন্ত আমার প্রাণবায়ু চলতে থাকুক, সজীব থাকুক, সচেতন থাকুক, অতঃপর নিরুদ্ধ হয়ে যাক। বুদ্ধ এ সংকল্প গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে ভূকম্পন শুরু হয়। মুহুর্মুহু প্রলয়দেব গর্জন করতে থাকে। এই ভূকম্পনে আনন্দ বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। এর হেতু কী জানতে আনন্দ দ্রুতগতিতে বুদ্ধের কাছে ছুটে যান এবং ভূকম্পনের কারণ জানতে চান। 

বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, ‘শোন আনন্দ, বোধিসত্ত্ব যখন মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হন, তখন তার পুণ্যতেজে ভূকম্পন হয়, যখন বোধিসত্ত্ব সম্বোধি জ্ঞান লাভ করেন তার তেজে ভূকম্পন হয়, বুদ্ধের প্রবর্তনকালে একবিংশ ভূমির প্রাণীগণের সাধুবাদ ধ্বনিতে ভূকম্পন হয়, আর যখন তথাগত আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেন, তখন পৃথিবী কারুণ্যে কম্পিত হয়। তিনি যখন নির্বাণ লাভ করেন, তখন পৃথিবী রোধন ধ্বনিতে কম্পিত হয়ে থাকে।

হে আনন্দ, আমি সম্বোধি লাভের অষ্টম সপ্তাহে উরুবিল্ল গ্রামের অজপাল নিগ্রোধমূলে উপবিষ্ট ছিলাম। সে সময় পাপমতি মার এসে আমাকে বলল, ‘হে ভগবান, আপনি এখন পরিনির্বাণ লাভ করেন। আপনার এখন পরিনির্বাণ লাভের উপযুক্ত সময়।’ তখন আমি মারকে বলেছি, যত দিন আমার ভিক্ষু-ভিক্ষুনি, দায়ক-দায়িকা, উপাসক-উপাসিকারা যথার্থ ধর্মবেত্তা বিনীত বিশুদ্ধ জীবনযাপনের যোগ্যতা অর্জন না করে, যত দিন তারা সদ্ধার্মর ব্যাখ্যা ও বিস্তার করতে না পারেন, যত দিন আমার সদ্ধর্ম প্রভাবশালী ও বর্ধনশীল না হয়ে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ ও তাদের দ্বারা অভিনন্দিত ও পরিগৃহীত না হয়, তত দিন আমি নির্বাণ লাভ করতে পারি না। হে আনন্দ, অদ্য সেই পাপমতি মার চাপাল সেজে আমার কাছে এসে আমাকে পরিনির্বাণের আবেদন জানায়। মারের প্রশ্নের উত্তরে আমি যা তাকে বলেছি তাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারল না।

মার আমাকে বলল, ভান্তে ভগবান, আপনার জীবনের ব্রত সমাপ্ত হয়েছে। আপনার দায়ক-দায়িকারা সবাই আপনার অতীত ধর্ম উপলব্ধি করেছে। আপনার প্রচারিত ধর্ম দেব-মনুষ্য সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং, আপনি এখন পরিনির্বাণপ্রাপ্ত 
 হতে পারেন। 

হে আনন্দ, তখন আমি মারকে বলেছি- হে পাপমতি মার তুমি শোনে খুশি হও, তথাগত আজ থেকে তিন মাস পর পরিনির্বাণ লাভ করবেন। হে আনন্দ, আজ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বৈশালীর চাপাল চৈত্যে তথাগত কর্তৃক আপন আয়ু সংস্কার জেনে-শোনে পরিত্যক্ত হয়েছে।

আনন্দ বুদ্ধের মুখে এ কথা শোনে শোকে কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘ভন্তে ভগবান, কল্পকাল এ দেহে অবস্থান করুন। হে সুগত, বহুজনের সুখের জন্য, দেব-মনুষ্যগণের ঐহিক পারত্রিক হিত সুখ কামনায় কল্পকাল এ দেহে অবস্থান করুন।

এবারের মাঘী পূর্ণিমা এমন সময়ে উদযাপিত হচ্ছে যখন দেশের সাধারণ মানুষ নানা সমস্যা অতিক্রান্ত করছে। পরিবার পরিজন নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকার অসম যুদ্ধে সবাই লিপ্ত। বুদ্ধ নির্দেশিত সব বাণী মানবের জন্য খুবই মঙ্গলদায়ক। তাই বলছিলাম, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে যার ধর্ম পালনে নিবিষ্ট হতে পারলে দেশ অচিরেই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পাব এবং পাশাপাশি দেশ সমৃদ্ধি লাভ করবে। আজকের শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সবাইকে জানাই লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক 

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   মধুময় স্মৃতি  মাঘী পূর্ণিমা 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: