বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আর নিছক পরিসংখ্যান নয়। এটি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যদিনের তীব্র সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখায় যে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯.০ শতাংশের কাছাকাছি বা তারও বেশি। কিন্তু এই শুকনো সংখ্যাগুলোর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে সেই সব হাজারো পরিবারের করুণ গল্প, যারা প্রতিদিনের খাবার তালিকা থেকে আমিষ কমিয়ে দিচ্ছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা স্থগিত করছে এবং অভাব মেটাতে গিয়ে চুপচাপ ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে ডুবে যাচ্ছে।
শহরের বাজারগুলোতে এখন এক থমথমে পরিস্থিতি। ক্রেতারা এখন পণ্যের গুণগত মান দেখার চেয়ে দাম নিয়ে বেশি চিন্তিত। বাজারে ক্রেতারা এখন দরকষাকষির চেয়ে মনে মনে হিসাব মেলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা তার উপার্জনের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় সবজির পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। চালের দাম থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কাছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আজ পরাজিত। বাজারের এই অবস্থা নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে এক চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কেবল শহরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামীণ এলাকায় এর প্রভাব আরও প্রকট। গ্রামীণ দিনমজুররা তাদের সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে মজুরি পান, তার সিংহভাগই ব্যয় হয়ে যায় কেবল চাল বা ভাত কেনার পেছনে। এর ফলে মাছ, মাংস বা ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার তাদের কাছে এখন ধরাছোঁয়ার বাইরের বিলাসবহুল বস্তুতে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা তাদের জন্য এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ এই পুষ্টিহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রায়ই রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই বড় বড় সূচক সংবাদপত্রে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। কিন্তু পারিবারিক পর্যায়ে এই প্রবৃদ্ধির প্রভাব খুব একটা অনুভূত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কাছে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর চেয়ে চালের কেজি বা তেলের লিটারের দাম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জাতীয় পর্যায়ে সূচকগুলোর উন্নতি হলেই সাধারণ মানুষের থালায় খাবার বেড়ে যায় না বা নিত্যপণ্যের দাম কমে যায় না, যা একটি বড় বৈষম্য।
একই সময়ে দেশের প্রধান রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে আয়ের হ্রাস লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারের মন্দা বা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে এই খাতের শ্রমিকদের আয় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে যখন ব্যয় বাড়ছে, তখন আয়ের এই সংকোচন শ্রমিকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। পোশাক শিল্পের লাখ লাখ নারী শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান এখন তলানিতে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধানের ফলে তারা মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মুদ্রাস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক মানুষ এখন সুদের কারবারিদের কাছ থেকে বা ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে টাকা ধার নিচ্ছেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি থাকার ফলে এই ঋণ আর শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মানুষ সুদের চক্রে আটকা পড়ছে। ঋণের এই বোঝা মেটাতে গিয়ে তারা তাদের সহায়-সম্বল বা শেষ জমানো সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে। এই নীরব আর্থিক পঙ্গুত্ব সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যের নিম্নসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে, যা থেকে উত্তরণ তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীতি-নির্ধারকদের এখন সামষ্টিক অর্থনীতির পাশাপাশি ক্ষুদ্র বা পারিবারিক অর্থনীতির দিকে নজর দিতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সুদের হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। ওএমএস বা সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, যদিও এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।
প্রবৃদ্ধি যদি সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মুদ্রাস্ফীতি যদি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও মুদ্রাস্ফীতি সেই সুফলকে ম্লান করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সাফল্য কেবল রিজার্ভ বা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দ্বারা নয়, বরং সাধারণ পরিবারগুলো ভয় ছাড়াই তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছে কি না, তা দ্বারা বিচার করা উচিত। প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনই এখন বড় চাওয়া।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল এবং সারের দাম বৃদ্ধি আমাদের দেশের মুদ্রাস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু আমরা আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তাই বিশ্ববাজারের যেকোনো পরিবর্তন আমাদের ওপর সরাসরি আঘাত করে। তবে এই নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কৃষকদের যথাযথ প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান করলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি ও বাফার স্টক তৈরি রাখা প্রয়োজন যাতে আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব কমানো যায়।
মুদ্রাস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক সংকট। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয় যখন তার নাগরিকরা খেয়ে-পরে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে। আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেন বৃদ্ধি পায় এবং বাজারের অস্থিরতা যেন কমে আসে, সেটাই সবার প্রত্যাশা। সরকার, ব্যবসায়ী এবং সুশীল সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে মুদ্রাস্ফীতির এই করালগ্রাস থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সময়ের আলো/কেএইচও