মো. শাহিন আলম, শিক্ষার্থী
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:২৬ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলোদেশ আবারও নির্বাচনের আবহে। পোস্টার, ব্যানার, স্লোগান আর সভা-সমাবেশে রাজনীতি যেন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি নির্বাচনের মতো এবারও প্রচারের মাঠ ভরে উঠেছে প্রতিশ্রুতি আর কথার লড়াইয়ে।
কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে ক্রমেই বাড়ছে সহিংসতা। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, অগ্নিসংযোগ এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। রাজনীতি যেন সহনশীলতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
একসময় রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সামাজিক সহাবস্থান ভেঙে পড়ত না। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল, রাজপথ সরব ছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা তখন এতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির চরিত্র বদলেছে।
ভিন্নমত মেনে নেওয়া বা প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার যে গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল, তা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় মতের পার্থক্য শুধু যুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি বদলে যাচ্ছে ভয়, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের ধারায়। ক্ষমতাও পরিণত হয়েছে এক ধরনের জিরো-সাম-গেমে, যেখানে এক পক্ষ টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে অন্য পক্ষকে কোণঠাসা করতে চায়। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে সহাবস্থান ও সহনশীলতার জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে সংঘাত, বর্জন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির হাতে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে রাজনীতির তৃণমূল, কারণ তারা থাকে মাঠের সামনের সারিতে। সিদ্ধান্ত না নিলেও কিন্তু সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতে হয় তাদেরই। মিছিল-মিটিং, পোস্টার, কেন্দ্র পাহারা; সবখানেই তাদের উপস্থিতি অনস্বীকার্য, আর সংঘর্ষ, মামলা বা দমন-পীড়ন শুরু হলে প্রথম আঘাতও পড়ে তাদের ওপর।
ক্ষমতার পালাবদলের গুঞ্জন বা রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় গ্রাম ও মহল্লায় নেমে আসে অদৃশ্য আতঙ্ক। কে কোন দলে, কার নাম তালিকায় আছেÑ এই অনিশ্চয়তা তৃণমূলকে রাতভর জাগিয়ে রাখে। ফলে নেতৃত্ব নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও মাঠপর্যায়ের কর্মীর জন্য রাজনীতি হয়ে ওঠে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আইন, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন নিরপেক্ষতার জায়গা হারায়, তখন রাজনীতি পরিণত হয় ভয় তৈরির হাতিয়ারে। মামলা, গ্রেফতার বা হয়রানি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তৃণমূল কর্মী শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনি ও সামাজিকভাবেও দুর্বল অবস্থানে চলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য বা একটি শেয়ার মুহূর্তেই কাউকে বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড় করাতে পারে। যেখানে বড় নেতাদের জন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকে, সেখানে তৃণমূল কর্মীর ক্ষেত্রে শুরু হয় বিচারহীন জনরোষ।
ফলে মাঠপর্যায়ের মানুষ এক ধরনের ডিজিটাল রাজনীতির ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সহনশীলতার অভাব কেবল রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমাজের ভেতরেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। একই গ্রামের মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় জমায়েত বা পারিবারিক সম্পর্কেও রাজনীতির ছায়া পড়ছে। রাজনৈতিক সহিংসতার আরেকটি নীরব দিক হলো পরিবার।
রাজনৈতিক কর্মীর স্ত্রী, সন্তান বা মা নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন। অনেক সময় সন্তানরাও স্কুল বা সমাজে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপমানের শিকার হয়। এসব ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব না থাকলেও ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে এসবের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
দিনশেষে শীর্ষ নেতৃত্ব নিরাপদ থাকে, আলোচনা হয়, সমঝোতা হয়, রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলায়, কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীর ভাগ্যে থেকে যায় মামলা, ভয় ও অনিশ্চয়তা। এই দ্বৈত বাস্তবতা রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করে এবং তৃণমূলের জীবন-জীবিকাকে আরও কঠিন করে তোলে।
সহনশীলতা ছাড়া রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যদি মানুষের জন্য হয়, তবে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। মাঠপর্যায়ের কর্মীর ঝুঁকি কমাতে নেতা ও প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে এবং ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস বা বিভাজনমূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মানুষকে শেখাতে হবে ভিন্নমতকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গ্রহণ করতে। স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে গ্রাম, মহল্লা ও ইউনিয়নের রাজনৈতিক পরিবেশ নিরাপদ করতে হবে, যাতে তৃণমূল কর্মী নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবন-জীবিকার ক্ষতি যেন না হয়। নইলে রাজনীতি ক্রমেই মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে, তৃণমূল আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং সেই শূন্যতা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। সহনশীলতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি পুনঃস্থাপন না হলে রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রতিযোগিতা কখনো সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক হতে পারবে না।
সময়ের আলো/এআর