অশান্ত বেলুচিস্তান : শান্তি কেন এখনো দূরের স্বপ্ন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বেলুচিস্তান আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও এটি সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রদেশটি উপ-জাতীয়

2026-02-04T14:18:55+00:00
2026-02-04T14:53:57+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
অশান্ত বেলুচিস্তান : শান্তি কেন এখনো দূরের স্বপ্ন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:১৮ পিএম  আপডেট: ০৪.০২.২০২৬ ২:৫৩ পিএম
গত বছর বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের হামলার শিকার জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনের টানেলের সামনে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা। সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বেলুচিস্তান আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও এটি সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রদেশটি উপ-জাতীয় বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ১৫ মার্চ ২০২৫ সালে বোলান এলাকায় জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনে বিদ্রোহী হামলার পর আবারও সেখানে সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এই ঘটনা বেলুচিস্তানে সহিংসতার নতুন অধ্যায়কে সামনে এনেছে।

তবে বেলুচিস্তানের সংকট সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পূর্ববর্তী জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূতকরণ ও প্রাথমিক বিরোধ

ঐতিহাসিকভাবে বেলুচিস্তান কখনও একটি সুসংহত স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এর একাংশ ছিল ব্রিটিশ শাসিত ‘চিফ কমিশনার্স বেলুচিস্তান’, আর বাকি অংশ ছিল বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের অধীনে। কালাতের খানাত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানে যোগ দিলেও আব্দুল করিম এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি এবং আফগানিস্তান থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটিই প্রথম বেলুচ বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিত।

বেলুচ জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই অন্তর্ভুক্তিকে জোরপূর্বক সংযুক্তি হিসেবে দেখা হয়। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক বঞ্চনা, সশস্ত্র প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রীয় সামরিক জবাবের একটি পুনরাবৃত্ত চক্র শুরু হয়। অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—যখন রাষ্ট্র উপ-জাতীয় দাবিকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বেলুচ বিদ্রোহের ধারাবাহিক ইতিহাস

(ক) ১৯৫৮ সালের বিদ্রোহ

১৯৫৫ সালে ‘ওয়ান ইউনিট’ পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের সব প্রদেশকে একক প্রশাসনিক কাঠামোয় আনা হয়। বেলুচ নেতারা এটিকে তাদের স্বায়ত্তশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখেন। নবাব নওরোজ খানের নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে সামরিক বিচারে অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তা পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়।

এই অধ্যায়টি দেখায় যে রাজনৈতিক সমাধান বাদ দিয়ে জোর প্রয়োগ করলে তা কেবল সাময়িক স্থিতি আনে, স্থায়ী শান্তি নয়।

(খ) ১৯৬০-এর দশকের উত্তেজনা

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক অধিকার, বামপন্থী চিন্তাধারা ও প্রাদেশিক বৈষম্যের প্রশ্নে বেলুচিস্তানে সংঘাত বৃদ্ধি পায়। এই সময় স্পষ্ট হয়—জাতিগত ও অর্থনৈতিক দাবিকে অবহেলা করলে অঞ্চলগুলো স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে সশস্ত্র পথে হাঁটতে পারে।

(গ) ১৯৭০-এর দশকের রক্তক্ষয়

১৯৭৩ সালে নির্বাচিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সরকার বাতিল করা হয় এবং সর্দার আতাউল্লাহ মেঙ্গালসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে সংঘর্ষে হাজার হাজার বেলুচ যোদ্ধা প্রাণ হারান। রাজনৈতিক অভিযোগের কোনো সমাধান না হওয়ায় এই সময় সংঘাত চরম রূপ নেয়।

(ঘ) জিয়া-উল-হকের পরবর্তী সময়

১৯৭৭ সালে জিয়া ক্ষমতায় এসে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে লড়াই বন্ধ হয়, কিন্তু বেলুচদের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি উপেক্ষিতই থেকে যায়। ফলে সমস্যার সাময়িক বিরতি হলেও তা পুরোপুরি মিটে যায়নি।

বর্তমান বিদ্রোহ ও উন্নয়নগত বৈষম্য

আজকের বেলুচ বিদ্রোহ পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

গোয়াদার বন্দর ও সিপিইসি : প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বেলুচিস্তানকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু স্থানীয় জনগণ এই উন্নয়ন থেকে বাস্তব সুফল না পাওয়ায় অসন্তোষ বেড়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ : গ্যাস, তামা ও অন্যান্য খনিজ উত্তোলনের লাভ মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও বহুজাতিক কোম্পানির কাছে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে, যা ক্ষোভকে আরও বাড়াচ্ছে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অবস্থান : বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট নিজেদের আন্দোলনকে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের দাবি—রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও স্থানীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন।

বহিরাগত ভূমিকা ও আঞ্চলিক টানাপোড়েন

ইসলামাবাদের অভিযোগ, ভারতসহ কিছু বিদেশি শক্তি বেলুচ বিদ্রোহকে উসকে দিচ্ছে। ২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদবকে গ্রেফতারের পর এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়। যদিও ভারত তা অস্বীকার করেছে, ঘটনাটি পাকিস্তান-বেলুচিস্তান সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।


সম্ভাব্য সমাধান 

জোরপূর্বক নিখোঁজ মোকাবেলা : রাষ্ট্রকে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। জোরপূর্বক নিখোঁজ বা বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি বিদ্রোহকে আরও প্রজ্বলিত করে। 

নির্বাচনীভাবে বৈধ প্রতিনিধিত্ব : প্রাদেশিক নেতৃত্ব ও জনগণকে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সম্ভব। 

সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন : একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ কমিটি তৈরি করা প্রয়োজন, যা অতীতের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের ঘটনা তদন্ত ও সমাধান করবে। 

অর্থনৈতিক ন্যায় ও স্থানীয় উন্নয়ন : খনিজ সম্পদ ও প্রকল্পের সুবিধা স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। এতে বিদ্রোহী মনোভাব কমানো সম্ভব। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া প্রদেশে স্থায়ী শান্তি আসবে না। শক্তি ও ভয়ের ভিত্তিতে শাসন করলে, জনগণ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে না এবং তথ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা হ্রাস পায়। 

বেলুচিস্তানের সমস্যা সমাধানের জন্য পাকিস্তানকে সামরিক নীতিতে থেকে সরে এসে, রাজনৈতিক পুনর্মিলন, অর্থনৈতিক ন্যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। শুধুমাত্র শক্তি ও জোরপূর্বক ব্যবস্থা দিয়ে শান্তি আনা সম্ভব নয়। স্থায়ী শান্তি স্থাপনের জন্য স্থানীয় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করা, তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে আস্থা পুনঃস্থাপন করা আবশ্যক।


/ইউএমএইচ


  বিষয়:   বেলুচিস্তান  পাকিস্তান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: