বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের একজন প্রার্থীর সঙ্গে ঢাকা সেনানিবাসের একটি প্রবেশপথে দায়িত্বরত মিলিটারি পুলিশ সদস্যদের কথোপকথন ভাইরাল হওয়ার পর সেনানিবাসে প্রবেশের বিধি-বিধান কিংবা নিয়ম-কানুন বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।। এর প্রেক্ষাপটে সেনানিবাসে বেসামরিক ও সরকারি ব্যক্তিদের প্রবেশসংক্রান্ত আইন, বিধি ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেনানিবাসের আইনি অবস্থান ও পরিচালন কাঠামো
ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট, ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সেনানিবাসকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় সেনানিবাস এলাকার ভূমি ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সুবিধা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে। সেনানিবাসে বসবাসকারী বেসামরিক নাগরিক থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সেনা আইনই সেখানে সর্বোচ্চ কার্যকর থাকে।
সেনা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনানিবাসের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা সদরের অধীন মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেট গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এসব নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে মিলিটারি পুলিশ, যারা সম্পূর্ণভাবে সামরিক চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করে কাজ করে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার জানান, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের গার্ডিয়ান হিসেবে স্টেশন কমান্ডার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন কর্মকর্তা এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন, যা অনেকটা স্থানীয় সরকারের মেয়রের দায়িত্বের সঙ্গে তুলনীয়। তবে নিরাপত্তা ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আসে সামরিক কর্তৃপক্ষের দিক থেকে।
অস্ত্র ও গানম্যান নিয়ে প্রবেশের বিধিনিষেধ
সেনানিবাসে অস্ত্র বহনের বিষয়ে বিধান অত্যন্ত কঠোর। সেনা আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা একমত যে, বেসামরিক যে কারও জন্য সেনানিবাসে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত অস্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ারের ভাষায়, বেসামরিক কেউ অস্ত্র নিয়ে সেনানিবাসে ঢুকতে পারবেন না। এই নিয়ম কেবল সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা অন্যান্য ভিআইপি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতি বছর ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা সেনানিবাসে গেলেও তাদের সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা গেইটেই অপেক্ষা করেন। ভেতরে প্রবেশের অনুমতি তাদের দেওয়া হয় না।
সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে নিয়ম
পুলিশ, আনসার কিংবা অন্যান্য সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সাধারণ নিয়ম হলো—অস্ত্র ছাড়া সেনানিবাসে প্রবেশ। সেনানিবাসের ভেতরে আইন প্রয়োগ, যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার একমাত্র দায়িত্ব মিলিটারি পুলিশের (এমপি) ওপর ন্যস্ত।
যদি পুলিশ কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত, মামলা সংক্রান্ত কার্যক্রম বা দাপ্তরিক প্রয়োজনে সেনানিবাসে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে আগে থেকেই সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে কোনো বিশেষ অভিযান, জরুরি পরিস্থিতি বা উচ্চঝুঁকির অপারেশনের ক্ষেত্রে সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
মিলিটারি পুলিশের ভূমিকা ও ক্ষমতা
অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, আর্মি সদর দফতর থেকে জারি করা সার্কুলার বাস্তবায়নের দায়িত্ব মিলিটারি পুলিশের। সেনানিবাসের প্রবেশপথে দায়িত্বরত এমপি সদস্যদের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেটি অমান্য করার সুযোগ নেই।
তিনি জানান, সেনাপ্রধান নিজেও যদি নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর সদর দফতরে যান, তাহলে তার সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা গেইটেই অপেক্ষা করেন এবং তিনি নিজেও অস্ত্র ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করেন। এটি সামরিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টান্ত।
মন্ত্রীরা বা উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সেনানিবাসে গেলে তাদের সঙ্গে থাকা পুলিশের গাড়ি ও গানম্যান গেইটেই অবস্থান করে। যার কাছে অস্ত্র থাকবে, তাকে অবশ্যই গেইটের বাইরে থাকতে হয়। এমনকি বৈধ লাইসেন্সধারী ব্যক্তিগত অস্ত্র থাকলেও সেটি ভেতরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ও বিশেষ অনুমতির বিষয়
তবে কিছু সীমিত পরিস্থিতিতে বিশেষ অনুমতির বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অস্ত্রসহ সেনানিবাসের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে অন্য গন্তব্যে যেতে চান, তাহলে তাকে আগেই অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিস্তারিত তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট লগ এরিয়ায় লিখিত আবেদন করতে হয়। এই আবেদন মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ডাইরেক্টরেটের সঙ্গে সমন্বয় করে যাচাই করা হয় এবং প্রয়োজন বিবেচনায় অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে এমন ক্ষেত্রেও সাধারণ নীতি অপরিবর্তিত থাকে—গানম্যান ভেতরে প্রবেশ করবেন না এবং গেইটেই অবস্থান করবেন। এই নিয়ম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব মিলিটারি পুলিশের ওপর বর্তায়।
সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কঠোর শৃঙ্খলা
মিলিটারি পুলিশের ক্ষমতা কেবল বেসামরিক বা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, সেনা কর্মকর্তারাও এই শৃঙ্খলার বাইরে নন। মেজর এমদাদুল ইসলাম জানান, রাত ১০টার পর কোনো সেনা কর্মকর্তা সেনানিবাস ত্যাগ করলে সেটিও মিলিটারি পুলিশ রিপোর্ট করতে পারে। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে কোনো নির্দিষ্ট দিনে কোনো সামরিক যান সেনানিবাসের বাইরে যেতে পারবে না এবং সেই নির্দেশ সব কর্মকর্তাকে মানতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কঠোর বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য হলো সেনানিবাসকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি আগেই প্রতিরোধ করা।
/ইউএমএইচ