বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে নারী ভোট টানার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে মোট ভোটার ১২.৭৭ কোটি, যার মধ্যে নারী ভোটার ৬.২৯ কোটি— প্রায় অর্ধেক।
বিএনপি নারী কেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি (যেমন ফ্যামিলি কার্ড, নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন) দিয়ে আকর্ষণ করছে। জামায়াত ধর্মীয় মূল্যবোধ ও তৃণমূলে প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ভোট টানার চেষ্টা করছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের প্রস্তাব উঠেছিল, অধিকাংশ দল একমত হয়। বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থী দেয়নি।
দলগুলো নারী ভোটারদের আকর্ষণে তৎপর, কিন্তু খালেদা জিয়ার নারী ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখছি না। একটি জাতির স্বপ্ন যখন অর্ধেক জনগোষ্ঠীর চোখে অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন সেই অন্ধকার ভেদ করে আলো জ্বালানোর সাহসী পদক্ষেপই ইতিহাস তৈরি করে। বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে সেই আলো জ্বালিয়েছিলেন একজন নারী খালেদা জিয়া। তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন একটি স্বপ্নের স্থপতি, যিনি দেখেছিলেন যদি মেয়েরা শিক্ষিত না হয়, তা হলে জাতির অর্ধেক শক্তি অকেজো থেকে যাবে। তার শাসনামলে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের মূল ভিত্তি। যা লাখ লাখ মায়ের স্বপ্ন, কন্যার হাসি এবং একটি জাতির উত্থানের কাহিনি।
ছয় দশক আগে, যখন খালেদা জিয়া ম্যাট্রিক পাস করেন, তখন মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ খুবই কম ছিল। মাত্র ২ শতাংশ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা পেত। গ্রামাঞ্চলে এই হার ১ শতাংশেরও কম ছিল। পরিবারে ছেলেদের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, মেয়েদের ক্ষেত্রে উল্টোটা। সাধারণ ধারণা ছিল মেয়েদের লেখাপড়ায় টাকা খরচ করা অপ্রয়োজনীয় ও অবাস্তব। তারা ঘরের কাজ, ভাই-বোন দেখাশোনা, মায়ের সাহায্য এবং বিয়ের প্রস্তুতির জন্য বেড়ে উঠবে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নারী শিক্ষার অবস্থাও ছিল করুণ। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ছিল মাত্র ২৮ শতাংশের কাছাকাছি, আর ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩-১৬ শতাংশ। এমন এক সময়ে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। তিনি বুঝেছিলেন— শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি অসম্ভব। তাই তিনি নারী শিক্ষাকে ধাপে ধাপে তার তিনবারের শাসনামলে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়, বিশেষ করে নারী শিক্ষায়।
তিনি বলতেন, ‘মেয়েরা শিক্ষিত হলে পরিবার শিক্ষিত হয়, সমাজ শিক্ষিত হয়, দেশ এগিয়ে যায়।’ এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় তার সবচেয়ে বড় কর্মসূচি—মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি। মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) অংশগ্রহণ বাড়ানো।
কর্মসূচির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল : মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে টিউশন ফি। মাসিক উপবৃত্তি। নিয়মিত উপস্থিতি (৭৫ শতাংশ ক্লাস), ভালো ফলাফল (৪৫ শতাংশ নম্বর) এবং অবিবাহিত থাকার শর্ত। এ ছাড়া বই, পরীক্ষার ফি ইত্যাদির সহায়তা।
ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি মেয়েদের মাধ্যমিক ভর্তির হার ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ঝরে পড়ার হার কমে যায়। বাল্যবিয়ের হার হ্রাস পায়, বিয়ের গড় বয়স বাড়ে। পরবর্তী প্রজন্মের মায়েরা শিক্ষিত হওয়ায় শিশুমৃত্যু ও অপুষ্টি কমে, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। এটি বিশ্বের অনেক দেশের জন্য মডেল হয়েছে—ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকার দেশগুলো এই ধরনের প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছে। এডিবির ২০২২ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে এই প্রোগ্রামের উন্নয়নমূলক সুবিধা তার খরচের চেয়ে ২০০ শতাংশ বেশি সফলতা পেয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি কোভিডের পর শিক্ষায় মেয়েদের ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখছে।
খালেদা জিয়া শুধু মাধ্যমিকেই থেমে থাকেননি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। শিক্ষা, খাদ্য প্রোগ্রামকে সম্প্রসারণ করেন। শিক্ষা বৃত্তি, উপবৃত্তি চালু করেন। ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন’ প্রণয়ন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকদের জন্য কোটা বাড়ানো হয়। পাঠ্যক্রমে বৈষম্যমূলক উপাদান অপসারণ। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। গ্রামে নতুন স্কুল, টয়লেট, পানি সুবিধার বিশেষ ব্যাবস্থা নেওয়া হয়। ১৭ হাজার প্রাথমিক স্কুল নির্মাণ/সংস্কার। মোট প্রাথমিক স্কুল ৮২ হাজার স্থাপিত হয়। ফলে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৭ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং লিঙ্গ সমতা অর্জিত হয়।
তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান ২০০২ সালের ১৯ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে Trade and aid in a Changed World শিরোনামে একটি নিবন্ধ বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মেয়ে অল্প বয়সে বিয়ে করে, কারণ তাদের পরিবারের স্কুলে রাখার সামর্থ্য নেই। ১৯৯৩ সাল থেকে মাধ্যমিক স্কুলে পড়া মেয়েরা ছোট একটি উপবৃত্তি পায় এবং স্কুলগুলো টিউশন সহায়তা পায়। এই উপবৃত্তি অলৌকিক কাজ করেছে : মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৬ শতাংশ হয়েছে এবং লিঙ্গ বৈষম্য প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’
১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়া নারীদের অবদানের সর্বোচ্চ
স্বীকৃতি হিসেবে ‘বেগম রোকেয়া পদক’ প্রবর্তন করেন। মেয়েদের জন্য দুটি গার্লস ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেন। মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সবকিছুতেই তার দূরদর্শিতার অবদান।
আজ তৈরি পোশাক খাতে লাখ লাখ নারী কাজ করছে, অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এর মূলে রয়েছে সেই শিক্ষা। শিশুমৃত্যু কমেছে, মাতৃমৃত্যু কমেছে, নারীর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। নারীরা চাকরি, সিভিল সার্ভিস, শিক্ষকতায় যোগ দিচ্ছে। সবই তার অবদানের ফসল।
খালেদা জিয়া একটি সমাজের মনস্তত্ত্ব বদলে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন নারী শিক্ষা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি জাতি গঠন এবং জাতীয় উন্নয়নের অংশ। তার কর্মসূচিগুলো আজও চলছে, লাখ লাখ মেয়েকে আলো দিচ্ছে। ২০০৫ সালে ফোর্বস তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থান দিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মায়েরা-মেয়েরা তাকে আরও বড় সম্মান দিয়েছে— হৃদয়ে স্থান।
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন কোনো মেয়ে স্কুলে যাবে, ততদিন খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে থাকবে নারী শিক্ষার সেই আলোকিত পথের সঙ্গে। তিনি ছিলেন সেই নারী, যিনি বলেছিলেন ‘আলো ছড়িয়ে দাও, অন্ধকার কেটে যাবে।’ আজ যারা নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখতে চায়, কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিতে চায়, মুক্ত বাতাসে ওড়ার ডানা কেটে দিতে চায়, তারা পরোক্ষভাবে থামিয়ে দিতে চায় নারীর উন্নতি ও অগ্রগতি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।
এফআর