দায় কি নেবে না রাষ্ট্র?

আবু বকর

একটি রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান হলো জনগণ। রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও অবনতি উভয়‌ই নির্ভর করে তাদের কার্যক্ষমতার ওপর। একটি গাড়ি যেমন চাকা

2026-02-07T02:19:49+00:00
2026-02-07T02:19:49+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
দায় কি নেবে না রাষ্ট্র?
রাজপথে কান্নার প্রতিধ্বনি
আবু বকর
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:১৯ এএম   (ভিজিট : ১৪৪)
দায় কি নেবে না রাষ্ট্র?
একটি রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান হলো জনগণ। রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও অবনতি উভয়‌ই নির্ভর করে তাদের কার্যক্ষমতার ওপর। একটি গাড়ি যেমন চাকা ছাড়া এর কার্যকারিতা থাকে না, তেমনি জনগণের সঠিক পরিচর্যা ছাড়া রাষ্ট্রের সঠিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের উপাদানের মধ্যে ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্বের সঠিক প্রয়োগ নির্ভর করে জনগণ পরিচালনার ওপর। 

আর আমাদের দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। তবে‌ বিপুল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১২ লাখ শিশু বাংলাদেশে শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে, প্রায় প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৪ জনের রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে-  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সবশেষ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন বলছে, ১৫ বছরের মধ্যে ও তার ওপরে যাদের বয়স তাদের সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে দেশের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার একটি অংশ যারা এখন‌ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর তারা হলো পথশিশু। দেশের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সিদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়।

আর সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতে সরকার আইনত বাধ্য। তবে কি এসবের কোনো সুবিধা পাচ্ছে পথশিশুরা? পরিসংখ্যান বলছে ১২ লাখ শিশু বাংলাদেশে শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে। বিপুল‌ এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের উপেক্ষা করে দেশ এগিয়ে নেওয়া কতটুকু কার্যকর হবে- এ প্রশ্ন থেকেই যায়। মূলত প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ফুল, যা নিজের রূপ দিয়ে গাছের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি চারপাশে ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকে। ঠিক তেমনি প্রতিটি শিশুর মধ্যেও কোনো একটি সম্ভাবনাময় প্রতিভা সুপ্তাবস্থায় থাকে, যা সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সে নিজে সমৃদ্ধ হয়ে দেশ সেবায় নিযুক্ত হবে। 

বিগত সময়ে সরকার পথশিশুদের শিক্ষা প্রদানে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এমনকি এদের কোনো জন্মনিবন্ধন পর্যন্ত‌ও নেই। ফলে তাদের সরকারিসহ নানা সেবা গ্রহণেও তৈরি হয়েছে বাধা। মূলত তাদের কেউ পিতা-মাতাহীন, কারও থাকলেও যত্নের অভাব রয়েছে। তাই পরিচয়হীন এই বৃহৎ গোষ্ঠীর যত্ন রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।‌ কারণ রাষ্ট্র‌ই হলো নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল।‌ সরকারের দায়িত্ব শুধু দেশ পরিচালনা নয়, বরং নাগরিকের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে। যদিও উন্নয়নশীল এই দেশে সরকারের পক্ষে তা অনেক চ্যালেঞ্জিং, তবু বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় তা নিশ্চিত করতে হবে।‌ প্রয়োজনে‌ প্রতি অর্থবছরে বাজেটের একটি অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় থেকে তাদের উন্নয়নে সুষম বণ্টন করতে হবে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য দেখা যায়, এটি প্রশংসাযোগ্য। তবে তা টেকসই সমাধান নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটি কার্যকরে‌ সর্বদলীয় মত নিতে হবে, যাতে সরকারের পালাবদলেও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে না যায়। 

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। পথশিশুরা সাধারণত কোনো সুস্থ পরিবেশে বসবাস করে না। রেলস্টেশন, ফুটপাথ, ব্রিজ ও রাস্তায় তারা বেড়ে ওঠে। প্রতিনিয়তই তারা সঙ্গ দোষে বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে।‌ তারা মাদক সেবন, চুরি, ছিনতাই, দলবদ্ধ গ্যাং সংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদি গর্হিত কাজ করে থাকে। এ ছাড়া অর্থের অভাবে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছে।‌ 

এ ছাড়া তাদের শিক্ষা না থাকা, খাদ্যের অভাবে পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসার অভাবে নানা জটিল অসুস্থতা, পোশাক ও বাসস্থানের অভাব তো‌ রয়েছেই। বিশেষ করে ঢাকা শহরে পথশিশুদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এমনকি বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের ব্যবহার করে নানা খারাপ কাজে ব্যবহার করাচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়। সার্বিক এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি টেকস‌ই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে ৫টি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।‌ 

এক. যেসব শিশুর মা-বাবার খোঁজ পাওয়া যায়, তাদের দায়িত্বভার নেবে শর্তে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া। এখানে ভাবনার বিষয় হলো সেসব বাবা-মায়েরা অর্থের অভাবে থাকায় সন্তানের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। তবে যেসব শিশুর পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায় না অথবা পেলেও তাদের ভরণপোষণে অনীহা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

দুই. শিশুদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতে সরকারের‌ পদক্ষেপ জরুরি। এখানে নির্মিত আবাসন ব্যবস্থায় প্রয়োজনে যেসব শিশুর মা-বাবা কর্মহীন, তাদের সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে থাকা আবাসন প্রকল্পে‌ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কর্মক্ষম সদস্যদের হাতেখড়ি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের কাজে নিযুক্ত করা। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আর্থিকভাবেও তারা লাভবান হবে।‌ রাষ্ট্রের অর্থনীতিও গতিশীল হবে।

তিন. শিশুদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ রাখা। কারণ যারা ইতিমধ্যে মাদকাসক্ত, তারা যাতে সেবন থেকে বিরত থাকে। আর শিশুদের প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া তাদের মন-মানসিকতা বিকাশে সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা।

চার. পরিসংখ্যান বলছে ১২ লাখ শিশু শ্রমে ঢুকছে, সংখ্যাটি নেহায়েত কম নয়। এ ক্ষেত্রে একসঙ্গে সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতি জেলায় পৃথকভাবে এসব আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা, যাতে সুষ্ঠুভাবে তাদের পরিচর্যা করা যায়। আর নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া সরকারি পরিষেবা গ্রহণ ও নিবন্ধিত নাগরিক পরিচয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। 

পাঁচ. মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারিভাবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে‌ নির্দিষ্টসংখ্যক লোকদের সমন্বয়ে আলাদা কমিশন গঠন করা। আর সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে, তারাও যাতে এ সচেতনতা ক্যাম্পেইন থেকে বঞ্চিত না হয়।

পথশিশুদের ওপর জিরো‌ টলারেন্স জারি করতে হবে। আর তাদের নিয়ে আলোচনা যদি শুধু কাগজে-কলমে ও আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।‌ এতে সরকারের ওপর এই বোঝা সামাল দেওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।‌ উন্নত দেশগুলো যাদের মতো হ‌ওয়া আমাদের স্বপ্ন বটে। 

তারা শুরুতেই আজকের মতো এই উন্নত ব্যবস্থায় পৌঁছায়নি, বরং সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, কঠোর নজরদারি ও উন্নয়নে অগাধ বিশ্বাসের ফলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। আর তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে‌ ছিল সর্বদলীয় সরকারের পূর্ণ সমর্থন। ফলে তাদের সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন হলেও জাতীয় স্বার্থে নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এখানে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো- মেধা পাচার।‌ আমাদের শিক্ষিত সমাজ আজ বিদেশে নিজের উন্নত জীবনের খোঁজে যাচ্ছে। কারণ রাষ্ট্র তাদের মেধার মূল্যায়ন করছে না। এখানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ।

তাই নিজ দেশের নাগরিকদের দেশের কল্যাণে নিয়োজিত করতে অবশ্যই সরকারকে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তায় কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আর দেশ এগিয়ে নিতে অবশ্যই প্রতিটি নাগরিকের যথাযথ পরিচার্যা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। শুধু সচ্ছল পরিবার‌ই শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা পাবে, আর বাকিরা অবহেলায় থাকবে এমন ব্যবস্থা দিয়ে রাষ্ট্র চলবে, কিন্তু কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: