নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছে–এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংখ্যাটি ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে ও ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হচ্ছে। তবে, বিষয়টি অন্ধভাবে পুনরুক্তি না করে গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে বলে মনে করে সরকার। নির্বাচনী সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বার্তায় এ কথা জানায়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং-এর বার্তায় বলা হয়েছে, পুলিশের নথি অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনাকে সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এর মধ্যে একটি ছিল তরুণ রাজনৈতিক নেতা ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ড। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয় উল্লেখ করে সরকার বলছে, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। এটি শুধু একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতাকে নীরব করার চেষ্টা ছিল না, বরং একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে দেশে আতংক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তবে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দেশ প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েনি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়নি।
সরকারের মতে, টিআইবির প্রতিবেদনে যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়নি, তা হলো প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনে ছয়জন নিহত হন। ২০১৮ সালের রাতের ভোটে প্রাণ হারান ২২ জন। আর ২০১৪ সালের সরকারিভাবে কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়। এই ইতিহাসের আলোকে বর্তমান নির্বাচন-পূর্ব সময়কে নিরাপত্তার ভয়াবহ ভাঙনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরা সহজে টেকসই হয় না বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
টিআইবির পরিসংখ্যান ও সরকারি তথ্যের পার্থক্য কোনো ধামাচাপা দেওয়ার ফল নয় উল্লেখ করে সরকার বলছে, এটি মূলত মৃত্যুর ঘটনাগুলো শ্রেণিবিন্যাস করার পদ্ধতি নিয়ে মতভেদের প্রতিফলন। টিআইবি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত যে কারো হত্যাকাণ্ডকে নির্বাচন-সম্পর্কিত বলে গণ্য করছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক। বিপরীতে সরকার কেবল সেসব মৃত্যুকেই গণনায় নিচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কার্যক্রমের সরাসরি ও প্রমাণযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। এই দুই পদ্ধতিকে সমানভাবে বিবেচনা করলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি ও নিরাপত্তাহীনতার ধারণা অতিরঞ্জিত হয়। বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জননিরাপত্তা এখনো নিখুঁত অবস্থায় নেই- এ কথা উল্লেখ করে বার্তায় বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরণ, অপব্যবহার ও দমনপীড়নের কারণে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। এ কারণেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি অন্তর্বর্তী, নির্দলীয় সরকারের দাবি জানিয়েছিল।
এতে বলা হয়, ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ বা বরখাস্ত করেছে, বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর ভূমিকা পর্যালোচনা করেছে, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করেছে এবং সমাবেশ ও নির্বাচনকালীন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে। ওসমান হাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন-এই তিনটি আবেগঘন ও নজিরবিহীন পাবলিক প্রোগ্রামের শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে, যেখানে আগে পেশাদারিত্ব অনুপস্থিত ছিল, সেখানে এখন সংযম ও পেশাদারিত্ব সম্ভব।
বার্তায় আরও বলা হয়, কোনো সরকারই সহিংসতার সব প্রচেষ্টা ঠেকানোর শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না, বিশেষ করে যখন প্রভাবশালী কিছু পক্ষ সচেতনভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নয়। নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মাঠে রয়েছেন। এই বাস্তবতাগুলো আশার জায়গা তৈরি করে, এই নির্বাচন হয়ত অবশেষে সেই ভয় ও সহিংসতা চক্রের অবসান ঘটাতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের নির্বাচনগুলোকে ঘিরে ছিল।
সময়ের আলো/এনএ