দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম নির্বাচনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলেন তারেক রহমান এবং একই সঙ্গে তিনি নিজেও এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তার নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনি প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং তার সমর্থকেরা তাকেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
তার দল বিএনপিও তাকে একক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছে, যদিও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়গুলো সামনে এনে প্রশ্ন তুলছে।
তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি এসব দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রায় সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে তার দলের পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি।
মূলত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আসাটা ছিল অনিবার্য কিন্তু তার একক নেতৃত্বের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো এবারের নির্বাচন। এর ওপরেই তার সাফল্য-ব্যর্থতার রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু হলো বলে মনে করেন তারা।
তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছেন তারেক রহমান, কিন্তু অতীতের সমালোচনা ও বিতর্ককে ছাপিয়ে এখন তিনি কীভাবে নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে তার দলকে নেতৃত্ব দেন- সেদিকেই সবার দৃষ্টি থাকবে।
যদিও এই নির্বাচনে নেই বিএনপির দীর্ঘকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করে রাখায় তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এককালীন মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের বিএনপির নেতৃত্বে আসাটা ছিল অনেকটা অনিবার্য।
আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, তারেক রহমানের সাফল্য হলো প্রতিকূল সময়ে বিদেশে থেকেও দল ভাঙতে না দেওয়া কিংবা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারা। যেভাবেই হোক তিনি সবসময়ই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই ছিলেন। দেশের বাইরে থেকে দল থেকে ধরে রাখায় সাফল্য তিনি দেখিয়েছেন। দেশে ফেরার পর আগের থেকে অনেক বেশি পরিণত মনে হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় হবে নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এর কতটা প্রতিফলন ঘটে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই এককভাবে দলের নেতৃত্ব দেওয়া ও নিজের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন তারেক রহমান।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, তারেক রহমান চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সুসংহত রাখতে পেরেছেন এবং এত সব কিছুর পর দলের নেতা হিসেবে তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা অনেকটা 'ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো' বলে মনে করেন তিনি।
‘রাজনীতির যে কানাগলি তা যেমন দেখেছেন, তেমনি এদেশের সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতির একটি অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলের নেতা থেকে সামনে দেশের নেতা হয়ে উঠতে পারেন কি-না সেটিই হবে এখন দেখার বিষয়’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, তারেক রহমান বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে এককভাবে উঠে এসেছেন এবং আওয়ামী লীগ না থাকার পরিস্থিতিতে তিনি একটি মঞ্চ পেয়েছেন কিন্তু এখন তাকে জনপরিসরে পরীক্ষিত হবার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। এবারের এই নির্বাচনকে ঘিরে তার সিদ্ধান্তগুলো যে শতভাগ ঠিক হচ্ছে তা কিন্তু এখনি বলা যাবে না। কারণ ৫০টির মতো আসনে তার দলেরই নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যা তিনি ঠেকাতে পারেননি। পাশাপাশি তার কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত, কাদের নিয়ে চলছেন, কি চিন্তা করছেন এগুলো মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়েই দেখছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
সময়ের আলো/জেডআই