২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন নতুন ও তরুণ ভোটাররা। একই সঙ্গে তারা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে অংশ নেবেন বহুল আলোচিত গণভোটেও।
এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে ঘিরে তরুণদের মনে কাজ করছে নানা প্রত্যাশা, ভাবনা ও দায়িত্ববোধ। তাদের চোখে এবারের নির্বাচন কেবল এক দিনের ভোটের বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সে কারণেই এ সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না তারা। নতুন ভোটারদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোও বলছে এবার অনেক কিছুই বদলে দেবে তরুণ ভোটাররা।
গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেই ভোটগ্রহণ। একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণভোটও যা রাষ্ট্রসংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ।
এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি তরুণ ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশে তাদের ভোট বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাওয়ার অনুভূতিকে জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন নতুন ভোটাররা। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালি লাগানোর মুহূর্তটি যেমন ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে থাকবে, তেমনি তা ভবিষ্যতের নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি ভিত্তিও তৈরি করবে বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান জানান, গত কয়েকটি নির্বাচন তিনি টেলিভিশনে দেখেছেন। তার ভাষায়, বাস্তবে তো নির্বাচন হয়নি।
প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাওয়ার অনুভূতি ও প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, আমরা যারা নতুন ভোটার, আমাদের অনেক প্রত্যাশা। আমার ভোট যেন অন্য কেউ না দিয়ে দেয়। নিজের ভোট যেন নিজেই দিতে পারি।
কোন বিষয়গুলো মাথায় রেখে ভোট দেবেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এসব প্রশ্নেই আমরা ভোট দিতে যাচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে, এই বিষয়গুলো সেটি নির্ধারণ করবে।
একই কথা বলেন ময়মনসিংহের নতুন ভোটার সামিয়া আক্তার। তিনি স্থানীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ভোটার তালিকায় নিজের নাম দেখে অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল। মনে হয়েছে রাষ্ট্র আমাকে একজন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন আমার দায়িত্ব সচেতনভাবে ভোট দেওয়া।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন এই ভোটারদের মনে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের প্রকৃত নীতি বাস্তবায়নের এক নতুন আশা জেগেছে। পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা এই প্রজন্মের চোখে নির্বাচন শুধু ভোট দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া নয়; এটি তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক বাস্তব প্রশ্ন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলেন, প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছি। আমি চাই আমার প্রথম ভোটটা এমন একজন প্রার্থীকে দিতে, যিনি সত্যিই কাজ করবেন। মানুষকে কথা বলতে বাধা দেবেন না। ফেসবুকে কিছু লিখলে পোস্ট ডিলেটের হুমকি আসবে না।
তিনি মনে করেন, দেশের উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনেক তরুণ-তরুণী বড় হয়েছেন পরিবারে নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনা শুনে। মা-বাবা কিংবা বড় ভাইবোনের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার গল্প, রাজনৈতিক উত্তেজনা, ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষা, এসব তাদের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতির অংশ। এতদিন তারা দর্শক ছিলেন, এবার সেই গল্পের ভেতরেই নিজের নাম যুক্ত করতে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফি রহমান বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম, মা-বাবা সকালে উঠে ভোট দিতে যেতেন। এখন আমিও ভোট দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে গ্রামে যাচ্ছি। এটি অন্যরকম একটা অনুভূতি। তার প্রত্যাশা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সরকারকে জোর দিতে হবে। একটা দেশের ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে। সেখানে যদি বিনিয়োগ না হয়, তা হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
ডিজিটাল যুগের ভোটাররা আগের প্রজন্মের তুলনায় তথ্যপ্রবাহে অনেক বেশি সংযুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টকশো সব মিলিয়ে তারা প্রার্থী ও দলের অবস্থান সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা নিয়েছেন।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভাবনা করিম বলেন, আমি শুধু মার্কা দেখে ভোট দেব না। প্রার্থীর অতীত কাজ, দলীয় অবস্থান, ইশতেহার, সবকিছু দেখে সিদ্ধান্ত নেব। প্রথম ভোট হেলায় নষ্ট করব না। তার মতে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভোটারদের দায়িত্বও বেড়েছে। যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সচেতন নাগরিকত্বের অংশ।
প্রথম ভোটের উত্তেজনার পাশাপাশি কিছু শঙ্কাও রয়েছে নতুন ভোটারদের মধ্যে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা কেমন থাকবে। আবার অনেকে চান, তাদের ভোট যেন সত্যিকার অর্থে গণনায় প্রতিফলিত হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, আমরা চাই আমাদের ভোটের মূল্য থাকুক। ভোট দিয়ে যেন মনে হয়, আমি সত্যিই পরিবর্তনের অংশ হয়েছি।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে তরুণদের ভোট একটি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি বাড়ায়। যে সমাজে তরুণরা ভোটে আগ্রহী, সে সমাজে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা বাড়ে বলে মনে করেন তিনি।
এফআর