দীর্ঘ প্রতীক্ষার নির্বাচনে সব পক্ষেরই জয়

এসএম আলমগীর

জাতীয়

সব শঙ্কা দূরে ঠেলে ‘ঈদ-উৎসবে’ বৃহস্পতিবার দেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিমধ্যে নির্বাচনের বেসরকারি ফলও প্রকাশ পেয়েছে। কোন

2026-02-14T00:49:56+00:00
2026-02-14T00:49:56+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
জাতীয়
দীর্ঘ প্রতীক্ষার নির্বাচনে সব পক্ষেরই জয়
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম 
ভোট গণনা। ছবি : সংগৃহীত
সব শঙ্কা দূরে ঠেলে ‘ঈদ-উৎসবে’ বৃহস্পতিবার দেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিমধ্যে নির্বাচনের বেসরকারি ফলও প্রকাশ পেয়েছে। কোন দল সরকার গঠন করবে, কারা বিরোধী দলে যাচ্ছে- সেটিও পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু কেমন হলো এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার ও বহু কাক্সিক্ষত এই নির্বাচনে আসলে জয় হয়েছে সব পক্ষের। তাদের মতে এই নির্বাচনের মাধ্যমে জিতেছে গণতন্ত্র, জিতেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঠিক একইভাবে বিএনপি জোট ২১২ আসন জিতে যেমন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে- এতে যেমন তাদের বিজয়, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটও তাদের রাজনৈতিক পথচলায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। তাই এটি জামায়াত জোটেরও বড় একটি জয়। আর এ নির্বাচনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বড় জয় হয়েছে, কারণ অনেক বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং সুশৃঙ্খল একটি নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে।

এ ছাড়া এবারের জাতীয় নির্বাচনে দীর্ঘদিন গণতন্ত্রহীন থাকা দেশ যেমন গণতন্ত্রের ধারায় ফিরতে পারছে, তেমনই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা কাটিয়ে দেশকে একটি স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার বড় নিয়ামক এবারের নির্বাচন। শুধু তাই নয়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা চলছে, সে পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে সচল করারও চাবিকাঠি হবে এই নির্বাচন।

এ বিষয়ে সুজনের সম্পাদক ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার সময়ের আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচনে সবার আগে জয় হয়েছে দেশের মানুষের- যারা দীর্ঘ দেড় যুগ পর নির্বিঘ্নে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এরপর জয় হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। কারণ দলগুলো ভোটের মাঠে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুবই দায়িত্বশীলভাবে ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। ভোটের মাঠে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান ছিল, কোনো দল নির্বাচন বর্জন করেনি, এখন পর্যন্ত কোনো দল ফল বর্জন করেনি। নির্বাচনের দিন কারও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার সে রকম বড় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যারা ভোট দিতে চেয়েছে তারা ভোট দিতে পেরেছে। তাই আমি মনে করি বৃহস্পতিবারের নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। সব পক্ষই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হলো।

আরেক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া খুবই দরকার ছিল। বিশেষ করে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, ব্যবসায়ীদের শ্বাস রোধ হওয়ার মতো অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জাতীয় নির্বাচনটি হওয়া বড়ই দরকার ছিল। কারণ অনিশ্চয়তার দোলাচলে অর্থনৈতিক-অগ্রগতি রীতিমতো থমকে ছিল। জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় এখন এসব ক্ষেত্রে স্বস্তি ফিরবে। অর্থনীতির চাকা সচল হবে।

কেমন হলো এবারের নির্বাচন : ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে দেশ পরিচালনা করা, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর একটি সাংবিধানিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি-জামায়াতসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তবে পূর্ববর্তী চারটি নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির দিনে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর, যেখানে উল্লেখ করা হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা ২৯৯টি। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেই আসনে ভোট স্থগিত করা হয়। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় বহু প্রতীক্ষিত সেই নির্বাচন।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর মধ্যে দলীয় ৬৩ জন ও স্বতন্ত্র ২০ জন। পুরুষ প্রার্থীর মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন। এবার ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। গণভোট পড়েছে ৬০.২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। মোট ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৯৯টি আসনে। এর মধ্যে ফল ঘোষিত হয়েছে ২৯৭টিতে। এর মধ্যে বিএনপি ও মিত্ররা পেয়েছে ২১২টি আসন, জামায়াত জোট পেয়েছে ৭৭টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন পেয়েছে ১টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যরা পেয়েছে ৭টি আসন। ফল স্থগিত রাখা হয়েছে ২টি আসনে।
আরও পড়ুন

ভোটে ছিল উৎসবের আমেজ : বিগত হাসিনা সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হওয়া সব নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোনোটিতে অর্ধেক এমপি নির্বাচিত করা হয়েছিল বিনাভোটে, কোনোটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাতের আঁধারে। ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি এতদিন। তাই এবার দীর্ঘ দেড় যুগ পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ভোটারদের মাঝে দেখা গেছে ব্যাপক-উৎসাহ উদ্দীপনা। ভোট উপলক্ষে সরকার বাড়তি ছুটি দেওয়ায় টানা চার দিন ছুটি পায় দেশের মানুষ। ফলে ভোটের দুই-তিন দিন আগে থেকেই গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটতে থাকেন। দুই ঈদের ছুটির সময় যেভাবে ট্রেনের ছাদে চেপে, লঞ্চের ছাদ চড়ে এবং বাস-পিকআপে চেপে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন, ঠিক সেভাবেই এবার ভোটের টানে মানুষকে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। এককথায় ভোটকে ঘিরে রীতিমতো সারা দেশে উৎসবের আমেজ পড়ে গিয়েছিল।

এত গেল ভোটের দিনের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতির চরিত্র। ভোটের দিনের চিত্র ছিল আরও জমজমাট। বিশেষ করে এবারের ভোটে নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে শহর-গ্রাম সর্বত্র ভোটের মাঠে নারী ভোটারের ঢল নেমেছিল। নারীরা সেজেগুঁজে দলবেঁেধ এসেছিলেন ভোটকেন্দ্রে। অনেকেই সঙ্গে করে এনেছিলেন ছোট্ট শিশুসন্তানকেও। এ ছাড়া দিনভর ভোট দিয়েছেন পুরুষ ভোটাররাও। সব মিলিয়ে দীর্ঘ দেড় যুগ পর একেবারে ঈদের আনন্দে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

এবারের নির্বাচনে আরেকটি বড় সফলতা- এই নির্বাচনে কোনো রক্তপাত হয়নি, অতীতের নির্বাচনগুলোর মতো ভোটের দিন লাশ পড়েনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল খুবই চমৎকার। 

ভোটের মাঠে দায়িত্বে ছিলেন ১ লাখের মতো সেনাসদস্য। যেখানেই কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, সেখানেই ছুটে গেছেন তারা। পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার সদস্য এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও সদা তৎপর ছিলেন ভোটের মাঠে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অংশগ্রহণমূলক, উৎসবমুখর এবং সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো গত ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার।

এএডি/


  বিষয়:   দীর্ঘ  প্রতীক্ষা  নির্বাচন  জয় 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: