যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন- আমদানি শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত সেই দেশের মানুষকেই বইতে হয়, যারা এটি আরোপ করে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সেই আশঙ্কাই সত্যি বলে প্রমাণিত হলো। অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি পাঠ। কিন্তু একুশ শতকের আমেরিকাকে এখন এই শিক্ষাটি নিতে হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই পরিশোধ করেছে দেশটির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ভোক্তারা। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ এবং কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সাম্প্রতিক গবেষণাতেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। খবর সিএনএনের।
সিবিওর বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী অতিরিক্ত এই খরচের বোঝা সামলাতে ব্যবসায়ীরা তাদের লাভের অংশ কিছুটা কমিয়ে আনলেও শুল্কের বড় অংশ প্রায় ৭০ শতাংশই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে, এই শুল্কের টাকা দেবে রফতানিকারক দেশগুলো। কিন্তু সিবিওর হিসাবে দেখা গেছে, বিদেশি রফতানিকারকরা এই দায়ের মাত্র ৫ শতাংশ বহন করছে। আর্থিক হিসাবে এই শুল্কের প্রভাব আরও স্পষ্ট। নির্দলীয় সংস্থা ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের মতে এই শুল্কের কারণে ২০২৫ সালে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে গড়ে বাড়তি এক হাজার ডলার করের বোঝা বইতে হচ্ছে।
অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এসব পরিসংখ্যানের গুরুত্ব খুব একটা নেই। তার কাছে অভিধানের ‘সবচেয়ে সুন্দর শব্দ’ হলো এই ‘শুল্ক’। অর্থনীতিবিদদের সম্মিলিত যুক্তি ট্রাম্পের এই শুল্ক-প্রীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। তবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এই শুল্কনীতি নিয়ে এখন চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও শুরু হয়েছে সমালোচনা। গত বুধবার কানাডার ওপর আরোপ করা শুল্ক বাতিলের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন ছয়জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা।
যদিও সিনেটে পাস হলেও ট্রাম্প সম্ভবত এই বিলে ভেটো দেবেন, তবু নিজ দলের সদস্যদের এই বিদ্রোহ হোয়াইট হাউসকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। এই ভোটের পরই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কংগ্রেসের যেসব রিপাবলিকান সদস্য তার শুল্কনীতির বিপক্ষে ভোট দেবেন, তাদের এর ‘পরিণাম’ ভোগ করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই ঝুলে আছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ওপর। এই শুল্ক আরোপের বৈধতা নিয়ে যেকোনো দিন আদালত রায় দিতে পারেন। আদালত যদি এই নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে তবে ট্রাম্পের পুরো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
তবে হোয়াইট হাউস এখনও নিজেদের অবস্থানে অনড়। এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেসাই এই শুল্কনীতির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের হার প্রায় সাতগুণ বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বড় বড় কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে। কুশ দেশাইয়ের দাবি- ট্যাক্স কমানো, নিয়মকানুন শিথিল করা এবং শুল্ক আরোপের মতো ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলোই মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করছে।
কিন্তু খাতা-কলমের এসব তথ্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের মিল পাওয়া কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ক্ষমতায় আসার ‘প্রথম দিন’ থেকেই সব জিনিসের দাম কমানোর যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, বাস্তবে তার দেখা নেই। একমাত্র ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। তবে এর কৃতিত্ব ট্রাম্পের শুল্কনীতির চেয়ে খামারিদেরই বেশি। মূলত বার্ড ফ্লুর প্রকোপ কমার ফলেই ডিমের সরবরাহ বেড়েছে এবং দাম কিছুটা কমেছে।
কাগজে-কলমে মার্কিন অর্থনীতিকে এখন বেশ শক্তিশালী মনে হচ্ছে। গত বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানুয়ারিতে ১ লাখ ৩০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের ধারণার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু এই সাফল্যের নেপথ্যে একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নতুন কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশই হয়েছে শুধু স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে। এর বাইরে অন্য প্রায় সব খাতের অবস্থাই শোচনীয়। অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়াঙ্ক বলছেন, পুরো অর্থনীতি মাত্র একটি স্তম্ভের ওপর ভর করে নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। মূলত স্বাস্থ্য খাতের কর্মসংস্থান, ধনীদের কেনাকাটা আর বড় টেক কোম্পানিগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগই এখন মার্কিন অর্থনীতিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের আলো/এসকে/