কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের মেহার গ্রামে ১০১ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে বৃটিশ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, হাজী নজর মামুদ বাড়ি জামে মসজিদ। চুন, সুরকি ও চিনামাটি দিয়ে নির্মিত এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই মসজিদটির কারুকার্য এলাকার মুসল্লীদের হৃদয়ে বইয়ে দেয় এক অপার্থিব শান্তির ছোঁয়া।
শত বছর পূর্বে, ১৯২৫ সালে, মেহার গ্রামের ধর্মপ্রাণ দানবীর হাজী নজর মামুদ মসজিদটি নির্মাণ করেন। পায়ে হেঁটে পবিত্র মক্কা শরীফে গিয়ে হজ পালনকালে তার মনে একটি মসজিদ নির্মাণের ইচ্ছে জন্মায়। তবে তৎকালীন বৃটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা থাকায়, জমিদার শ্রী ভৈরব চন্দ্র সিংহের অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করা দুষ্কর ছিল।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, জমিদার কেবল অনুমতি দেননি, বরং নিজে উপস্থিত থেকে মসজিদের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। হাজী নজর মামুদ এবং জমিদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১০ শতাংশ জমির উপর নির্মিত হয় এই নান্দনিক মসজিদ। আজও এটি স্থানীয় জনগণের কাছে সৌহার্দ্যের স্মৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির নজরকাড়া কারুকার্যের পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। তিন ফুট পুরু দেয়ালগুলো চুন-সুরকির ঢালাই দিয়ে নির্মিত, যা গরমে ভেতর ঠান্ডা, শীতে ভেতর উষ্ণ রাখে। দেয়ালে খোদাই করে বসানো হয়েছে চিনামাটির রঙিন ভাঙা টুকরো, যা আলো পড়লে ঝিলমিল করে উঠে। ভেতরে মিম্বারের সুনিপুণ কারুকার্য মুসল্লীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
হাজী নজর মামুদ শুধু মসজিদ নির্মাণেই থেমে থাকেননি। মুসল্লীদের অজু করার সুবিধার্থে তিনি ১২০ শতক জমি নিয়ে একটি পুকুর খনন করেন, যার পাকা ঘাট আজও তার স্মৃতি বহন করছে। মসজিদের বিভিন্ন ব্যয়, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন এবং পবিত্র শবে মেরাজ, শবে বরাত ও শবে কদরের রাতে মুসল্লীদের আপ্যায়নের খরচ বহন করতে তিনি মোট ২৬৪ শতক জমি ওয়াক্ফ করেছেন।
মেহার গ্রামের শাহ আলম জানালেন, মসজিদটিতে আগে ১০০-১২০ জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারতেন। ১০-১২ বছর আগে মুসল্লীর সংখ্যা বাড়ায় সামনের দিকে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে একসাথে ২০০-২৫০ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে।
সরকারি নথিপত্রে মসজিদের নাম নিয়ে কিছু ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও ‘মেহার মধ্যপাড়া হাজি বাড়ি জামে মসজিদ’, কোথাও ‘মেহার রমিজ হাজী বাড়ির জামে মসজিদ’ নামে উল্লেখ আছে। তবে ইতিহাস ও স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এটি হাজী নজর মামুদ জামে মসজিদ হিসেবে সমাদৃত।
কালের বিবর্তনে আধুনিক দালানকোঠা নির্মাণ হলেও চুন-সুরকি ও চিনামাটির এই স্থাপত্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক মহান সাক্ষী। বৃটিশ আমলে নির্মিত এই মসজিদ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বাক্ষী। হাজী নজর মামুদের নির্মিত এই মসজিদ কেবল মেহার গ্রামের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য নয়, বরং পুরো চান্দিনার মানুষের কাছেই সমাদৃত।
সময়ের আলো/আরবিএন