জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসে লেনদেন শুরু হতেই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের পুঁজিবাজার। সূচনার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১০০ পয়েন্টেরও বেশি বেড়ে যায়। লেনদেনের প্রথম পাঁচ মিনিটেই অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় (সার্কিট ব্রেকার) পৌঁছায়।
এ ছাড়া সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর মাত্র প্রথম ২০ মিনিটেই লেনদেন হয়েছে ২২৫ কোটি টাকারও বেশি। যেখানে এতদিন পুরো সাড়ে ৪ ঘণ্টায় লেনদেন হয়েছে ২০০ কোটি টাকার ঘরে। সব মিলিয়ে দিনটিতে বড় উত্থানের দেখা মিলেছে শেয়ারবাজারে। প্রায় ৫ মাস পর ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে দিনটিতে।
এতে যেন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে ‘প্রত্যাশার বারুদ’। অনেকে এটিকে ‘রিলিফ র্যালি’ বলছেন অর্থাৎ, অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার স্বস্তি থেকেই এই উল্লম্ফন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং নতুন সরকারের দ্রুত নীতিগত দিকনির্দেশনার আশায় বিনিয়োগকারীরা কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। নির্বাচনের আগে টানা কয়েক মাস অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার কারণে বাজারে স্থবিরতা ছিল। অনেক বিনিয়োগকারী সাইডলাইনে ছিলেন। ফল ঘোষণার পর তারা নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
লেনদেনের শুরুতেই ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা ও বড় মূলধনি কোম্পানির শেয়ারে ক্রেতার চাপ বেশি দেখা যায়।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা জানান, বাজারে বিক্রেতা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় দর দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অনেকে এটিকে ‘রিলিফ র্যালি’ বলছেন- অর্থাৎ, অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার স্বস্তি থেকেই এই উল্লম্ফন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশাই নয়, অর্থনৈতিক সংস্কার, সুদহার নীতি, ডলারবাজার স্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন সরকারের পদক্ষেপের দিকেও নজর থাকবে। যদি ঘোষিত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা স্থায়ী হতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, টেকসই ঊর্ধ্বগতির জন্য করপোরেট আয় বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন পর বাজারে ইতিবাচক সাড়া দেখতে পেয়ে তারা আশাবাদী। তবে কেউ কেউ দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার কথাও উল্লেখ করেছেন, যা সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের পরদিনই শেয়ারবাজারে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেল, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে পুঁজিবাজার কতটা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এই ‘প্রত্যাশার বারুদ’ সাময়িক উল্লাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি স্থিতিশীল ও সংস্কার-ভিত্তিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি গড়ে তোলে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর দলীয় সরকারের অধীনে দেশ পরিচালনার ভার আসতে থাকায় বহির্বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পথ উন্মোচন হবে। যার ইতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারে আসবে। তা ছাড়া নির্বাচিত সরকারের সময় শেয়ারবাজারের গুরুত্ব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়িয়েছে, যার ফলস্বরূপ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন এই উত্থান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের মতো ক্ষণস্থায়ী হবে। দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ব্যাংকিং সেক্টরের সুদহার কমিয়ে আনতে হবে।
এ বিষয়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশেকুর বলেন, শেয়ারবাজারে আজকে যে মুভমেন্ট হয়েছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমরা সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে কয়েক দিন যেমন উত্থান দেখেছি, এটি তেমনই কয়েক দিনের উত্থানের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে। যতদিন ব্যাংকিং সেক্টরে ইন্টারেস্ট রেট হাই (উচ্চ সুদহার) থাকবে, ততদিন দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারে উন্নতির চিন্তা করাটা কঠিন। এটি (সুদহার) কমে এলে শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
রোববারের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে সব খাত মিলিয়ে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ২৬টির। আর ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাত্র ৩০টি বাদে সবগুলো শেয়ারের দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার লেনদেন শেষে সূচকটির অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৪০০ পয়েন্টে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৩০ পয়েন্ট বা প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৮৬ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
সবকয়টি মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই লেনদেনের পরিমাণ গত মঙ্গলবারের চেয়ে ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। এক্সচেঞ্জটিতে গতকালকের চেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছিল গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর, যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সেই হিসেবে প্রায় ৫ মাসের মধ্যে গতকাল সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। এটি এই সময়ের মধ্যে প্রথম হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন।
অন্যদিকে কালকের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল সিটি ব্যাংকের শেয়ারে, ব্যাংকটির মোট ৮০ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার, যার পরিমাণ ৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর ৪১ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়ে শীর্ষ তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
লেনদেনের বিষয়ে মো. আশেকুর রহমান বলেন, যেকোনো সরকার পরিবর্তনে শেয়ারের আগ্রহে পরিবর্তন হওয়াটা অযৌক্তিক নয়। ঢাকা ব্যাংকের শেয়ারে গত কয়েক দিন যে উত্থান হয়েছে, এটি স্বাভাবিক। মার্কেট মুভমেন্ট সবসময় ফান্ডামেন্টাল নির্ভর হয়ে চলে না, সেন্টিমেন্টালে নির্ভর করেও অনেক সময় মুভমেন্ট হয়। তবে গতকালের (রোববার) যে উত্থান তা কয়েক দিন পর স্থির পর্যায়ে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে।
দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গতকাল সবগুলো মূল্যসূচক বেড়েছে। এর মধ্যে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৯ পয়েন্টে উঠেছে। আর প্রধান সূচক সিএসসিএক্স ২৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৫৫৫ পয়েন্ট হয়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৭টির এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। গত মঙ্গলবার লেনদেন হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, আমাদের ধারণা আগামী কয়েক দিন বাজার ভালো থাকবে। তবে বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ-বান্ধব পলিসি নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামনে চ্যালেঞ্জ হলো ভালো ভালো কিছু আইপিও আনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যাংকে যেন লুটপাট না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। আমরা আশা করছি, সরকার এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
সময়ের আলো/এআর