ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চাইছে যা উভয়পক্ষের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে। ইরানি একজন কূটনীতিক এমনটি জানিয়েছেন বলে খবর দিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। আগামী মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের বৈঠকের আগে রোববার এমনটি জানিয়েছেন এই কূটনীতিক। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। এ নিয়ে উত্তেজনায় সম্ভাব্য নতুন সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিতে আছে দেশ দুটি। এ ঝুঁকি এড়াতে দেশ দুটি চলতি মাসের প্রথম দিক থেকে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরী ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানসহ ব্যাপক সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। সম্প্রতি ওই জলসীমার উদ্দেশে দ্বিতীয় আরেকটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে তারা।
মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আলোচনা সফল না হলে যুক্তরাষ্ট্র লম্বা সময় ধরে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিনবাহিনী আক্রমণ করলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে ইরান কিন্তু রোববার তারা একটি সমঝোতামূলক লাইনে কথা বলেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। রয়টার্স ইরানের আধাস্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা ফার্সের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অথনৈতিক কূটনীতিবিষয়ক উপপরিচালক হামিদ ঘানবারি বলেছেন, চুক্তির স্থায়ীত্বের স্বার্থে এটি জরুরি যে যুক্তরাষ্ট্রও যেন দ্রুত ও উচ্চ লাভের ক্ষেত্রগুলো থেকে সুবিধা পায়। তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, যৌথক্ষেত্র, খনিতে বিনিয়োগ আর আকাশযান কেনার মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত। তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে তেহরানের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষিত করেনি।
ওই চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংকুচিত করার বিনিময়ে তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে ফের তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেন। শুক্রবার একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, মঙ্গলবার জেনিভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক হতে পারে। মার্কিন প্রতিনিধি দলে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জেরার্ড কুশনারও থাকবেন। পরে রোববার ইরানি কর্মকর্তারা এই বৈঠকের কথা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আলোচনা বহুপক্ষীয় হলেও চলমান তেহরান-ওয়াশিংটন বৈঠক শুধু এই দুপক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই আলোচনায় ওমান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
এদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, তেহরান-ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি হলে তাতে কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিষয়টি থাকলে হবে না, ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ভেঙে ফেলার বিষয়টিও অবশ্যই থাকতে হবে। রোববার মেজর আমেরিকান জুইশ অর্গানাইজেশন্সের প্রেসিডেন্টদের এক বার্ষিক সম্মেলনে নেতানিয়াহু নিজেই এ কথা জানান বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইসরাইলকে গাজায় সব সুড়ঙ্গ ধ্বংসের কাজ শেষ করতে হবে জানিয়ে এ কট্টর-ডান রাজনীতিবিদ বলেন, গাজায় আনুমানিক ৫০০ কিলোমিটারের মতো সুড়ঙ্গ রয়েছে, ইসরাইল তার মধ্যে দেড়শ কিলোমিটার ধ্বংস করতে পেরেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে এ সপ্তাহেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা দ্বিতীয় দফায় বসতে যাচ্ছেন। দুই পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক পরমাণু চুক্তি করার চেষ্টা করছে বলে রোববারই ইরানি এক কূটনীতিকের বরাতে খবর এসেছে।
তবে নেতানিয়াহু বলছেন, তিনি চুক্তির ব্যাপারে সন্দিহান। যদি হয়ও তা হলে তাতে অবশ্যই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি থাকতে হবে। সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা থাকতে পারবে না, কেবল সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া বন্ধই নয়, সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত হয় এমন উপকরণ ও অবকাঠামোও ভেঙে ফেলতে হবে, বলেছেন তিনি। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশকের বিরোধ নিরসন ও নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফের আলোচনা শুরু হয়।
আলোচনা সফলতার মুখ না দেখলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলবে এমন সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা কয়েক দিন আগেই রয়টার্সকে বলেছিলেন। ওয়াশিংটন এরই মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি বিমানবাহী রণতরীকেও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠিয়েছে। রোববার নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, তিনি আগামী ১০ বছরের মধ্যে ইসরাইলের যেন আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা না লাগে তার লক্ষ্যে তিনি কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের এখন যে ১০ বছরের চুক্তি তাতে তারা প্রতি বছর ওয়াশিংটন থেকে ৩৮০ কোটি ডলারের সহায়তা পাচ্ছে, যে অর্থের সিংহভাগ মার্কিন অস্ত্র-সরঞ্জাম কিনতেই খরচ হচ্ছে। এ চুক্তি ২০২৮ সালে শেষ হবে। বিকাশমান অর্থনীতির কারণে আমরা এখন যে সামরিক সাহায্য পাচ্ছি, তার আর্থিক অংশটুকু ধীরে ধীরে বন্ধ করার সুযোগ আছে আমাদের, আমি প্রস্তাব করছি এটি ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শূন্যে নেমে আসুক। এখনকার সমঝোতা স্মারকের আরও তিন বছর বাকি, তার পরের সাত বছরে এটি শূন্যে নামানো যাবে, বলেছেন নেতানিয়াহু। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে সাহায্যপ্রাপ্তি থেকে অংশীদারত্বে রূপান্তর করতে চাই, বলেছেন তিনি।