সৌদি-হুথি সংঘাত বাড়ছে, পক্ষ বেছে নিতে চাপে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গত এক বছর ধরে পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা অংশীদার এবং অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগের পেছনের চ্যানেল হিসেবে দ্বৈত

2026-09-11T17:41:31+00:00
2026-09-11T17:41:31+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সৌদি-হুথি সংঘাত বাড়ছে, পক্ষ বেছে নিতে চাপে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪১ পিএম 
ইয়েমেনের আল-জাওফ স্থানে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে লড়াইয়ের সময় হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ছবি : রয়টার্স
গত এক বছর ধরে পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা অংশীদার এবং অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগের পেছনের চ্যানেল হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলন ও সৌদি বাহিনীর মধ্যে চলতি সপ্তাহের লড়াই ক্রমেই ইসলামাবাদের জন্য এই দুই অবস্থান একসঙ্গে ধরে রাখা কতটা সম্ভব, তা কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে।

গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের জন্য এই সংঘাত প্রথম বড় পরীক্ষা। এর আগে ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। নতুন ব্যবস্থার অধীনে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। 

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, হুথিদের হুমকি ইসলামাবাদকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার দিকে আরও বেশি ঠেলে দিতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনায় হুথিদের বর্তমান হুমকি পাকিস্তানের জন্য আরও সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে। 

জুলাই মাসে দুই পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে, ফলে তারা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। 

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব চুক্তির সঙ্গে প্রায়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে।

তবে পাকিস্তান একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরশীল। ইরান ও হুথিরা যে এসব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম, তা ইতোমধ্যে দেখা গেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি তেহরানকে বিরূপ না করারও কারণ রয়েছে ইসলামাবাদের।

ইরানকে সতর্কবার্তা

অতীতে ইরান ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কয়েকবার প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। দুই বছর আগে ইরান পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে সীমান্তের কাছে কথিত জঙ্গি আস্তানায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর জবাবে পাকিস্তান পাল্টা হামলা চালায়। এতে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলেও পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এবার পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।

সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে পাকিস্তান ইরানকে সতর্ক করে ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় সব দিক থেকে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় চালুর উপায় নিয়ে কথা হয় বলে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, সৌদি-হুথি সংঘাতে পাকিস্তান লো প্রোফাইল বজায় রাখার চেষ্টা করছে, কারণ পাকিস্তানের নিজেদের স্বার্থও বড়। তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।  

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, হুথিদের হামলার জবাবে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে আলোচনায় নেই। 

তিনি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে ধারাবাহিকভাবে প্রশংসা করেছে। পাকিস্তান সবসময় উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছে এবং সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। 


ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চেষ্টা

প্রকাশ্যে ইরানি কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, তারা প্রতিরক্ষা জোটটিকে হুমকি হিসেবে দেখেন না।

তবে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিন ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ব্যক্তিগত আলোচনায় পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের মতে, পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ভালো হলেও মধ্যস্থতার ফল এনে দেওয়ার মতো সক্ষমতা বা কাতারের মতো অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারীদের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের নেই।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। 

পাকিস্তান এখন যে কঠিন ভারসাম্যের দায়িত্ব নিয়েছে, তার ব্যাপ্তি বোঝার পর ইসলামাবাদ কিছুটা অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে, এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব গত বছর প্রাথমিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার পর কুয়েতও প্রায় একই ধরনের একটি চুক্তি করতে আগ্রহী হয়েছিল।

কিন্তু ইরানের হামলার ঝুঁকিতে থাকা আরেকটি উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ব্যাপারে সতর্ক পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলোচনার পরিধি কমিয়ে দেন।

শেষ পর্যন্ত গত মাসে ইসলামাবাদে পাকিস্তান ও কুয়েত একটি অপেক্ষাকৃত সীমিত প্রতিরক্ষা প্রটোকল স্বাক্ষর করে। এতে প্রশিক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে কুয়েত যে ধরনের বিস্তৃত চুক্তি চেয়েছিল, সেটি হয়নি।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খান বলেন, বর্তমানে পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক জোটে নতুন কোনো সদস্য যুক্ত করার পরিকল্পনা নেই।

মধ্যস্থতাকারী, নাকি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী? 

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ প্রশ্ন তুলেছেন, তেহরানের কাছে ইসলামাবাদের ওপর আস্থা আসলে কতটা শক্ত ছিল।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের কাছে কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের যে সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা নেই। তার মতে, পাকিস্তানের বাড়তি কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির নিজস্ব কূটনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। 

ট্রাম্প বিভিন্ন সময় মুনিরকে তার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের বিরল খনিজে প্রবেশাধিকার এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার পর তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়।

পাকিস্তান-ইরান সম্পর্কবিষয়ক ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক কামরান বুখারি বলেন, তেহরান ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মূলত এই কারণে যে পাকিস্তান রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

তার মতে, ইসলামাবাদের এই অবস্থান তাকে এমনভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ দেয়, যা সত্যিকারের নিরপেক্ষ কোনো পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। রিয়াদ ও ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে ঠিক এই সুবিধাটিই কাজে লাগাচ্ছে। 

কিন্তু হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়লে এই হিসাব বদলে যেতে পারে। 

বুখারি বলেন, বার্তা আদান-প্রদান ও প্রভাবিত করা এক বিষয়; কিন্তু সক্রিয় বিমান প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, এতে পাকিস্তান স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠতে পারে। 

সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যার হিসাবে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সামরিক বাহিনী পাকিস্তান। আগের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে দেশটি ইতোমধ্যে সৌদি আরবে হাজার হাজার সেনা ও এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে।

একই সময়ে ভারত সীমান্তেও পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে।

তাই একই ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাওয়া অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপও এখন সামলানোর চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ।

বুখারির ভাষায়, পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন করে সামরিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   সৌদি-হুথি সংঘাত  পাকিস্তান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: