জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের ওপর হুথি বিদ্রোহীদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং রিয়াদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। সদস্য দেশগুলো সতর্ক করে বলেছে, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর প্রথমবারের মতো ইয়েমেন আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইয়েমেনবিষয়ক নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশ যুক্তরাজ্য এবং বাহরাইনের অনুরোধে এই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর হুথি বাহিনী দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি সামরিক বিমানঘাঁটি ও কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনাও ছিল।
হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়। এতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং জাজানের একটি বড় তেল শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, বড় ধরনের সংঘাত ফিরে আসার বিষয়ে তার বারবার দেওয়া সতর্কতা এখন কঠিন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
গ্রুন্ডবার্গ জানান, হুথি বাহিনী মোখা বন্দরনগরী দখল করেছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথের তীরে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও বলেন, লড়াই মারিব, জওফ ও আল-বাইদা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাইজ, হোদেইদাহ, আল-বাইদা ও জওফে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। মারিবে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে গোলাবর্ষণে শিশুরা নিহত হয়েছে এবং বহু আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়েছে।
গ্রুন্ডবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে দেশজুড়ে ১১,৪০০-এর বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই তাইজের বাসিন্দা। চলমান সংঘাত মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করছে।
তিনি সৌদি আরবের বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হুথিদের হামলার নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে ও সীমান্তের ওপারে হামলা, এবং বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে হামলা ও হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেন, এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে আরও বিস্তৃত ও অমীমাংসিত আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে টেনে নিতে পারে, যার বৈশ্বিক প্রভাব পড়বে। তিনি সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার পথ ধরে রাখার আহ্বান জানান।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অবস্থান
জাতিসংঘে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) পক্ষ থেকে বাহরাইনের প্রতিনিধি জামাল ফারেস আলরোয়াইয়ি বলেন, জোটটি “সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানায়।
তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন।
তার ভাষায়, এসব হামলা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ও সরাসরি হুমকি। জিসিসির সদস্য দেশগুলো সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে নিজেদের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে।
জোটটি সৌদি আরবের নাগরিক ও সম্পদ রক্ষায় দেশটির নেওয়া সব পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে এবং আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি হুথিদের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকির নিন্দা করে অপরাধী ও তাদের সমর্থকদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান
জাতিসংঘে মার্কিন মিশনের রাজনৈতিক সমন্বয়কারী জেন নাইডহার্ট বলেন, ৮ সেপ্টেম্বরের হামলা সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও বেসামরিক জীবনের প্রতি হুথিদের নির্লজ্জ অবজ্ঞার সর্বশেষ উদাহরণ।
তিনি বলেন, হুথিরা ইয়েমেনের নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে—শহরে বোমা হামলা চালিয়েছে, হাজার হাজার ইয়েমেনি পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং মোখার বন্দর অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, যার মূল্য কয়েক কোটি ডলার।
নাইডহার্টের মতে, এসব হামলা সৌদি আরব ও ইয়েমেন—উভয়ের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
তিনি হুথিদের ইরানের এজেন্ট ও হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এসব হামলার পেছনে ইরানের ভূমিকা স্পষ্ট। তিনি হুথিদের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে হুমকির বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে এই হামলার যোগসূত্রের কথা বলেন।
নাইডহার্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে সৌদি আরবের পাশে রয়েছে এবং দেশটির ভূখণ্ড ও নাগরিকদের রক্ষা করার অধিকারকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারকে হুথি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে।
ওয়াশিংটন হুথিদের সৌদি আরব, ইয়েমেনের বৈধ সরকার এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি হুথিদের সামরিক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সম্পদ বন্ধ করতে বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলো আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে।
নাইডহার্ট বলেন, নিরাপত্তা পরিষদকে এক কণ্ঠে কথা বলতে হবে। এই উত্তেজনা মেনে নেওয়া যায় না এবং যারা এটিকে সক্ষম করে তুলছে, তারা এর পরিণতির জন্য দায়ী।
যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি কেট ফস্টার বলেন, এই সংকটের জন্য হুথিরাই সম্পূর্ণ দায়ী। তিনি বলেন, তাদের কর্মকাণ্ড লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর প্রভাব প্রথমে এবং সবচেয়ে বেশি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভোগ করতে হবে।
তিনি জানান, ২ কোটি ২০ লাখের বেশি ইয়েমেনির মানবিক সহায়তা প্রয়োজন এবং ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। ফস্টার বলেন, ইরানের দীর্ঘদিনের হুথি-সমর্থন অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে চলেছে। তিনি তেহরানকে হুথিদের অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমদ আবহা, জাজান ও নাজরানে বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনার ওপর হামলার নিন্দা করেন। তিনি এগুলোকে সৌদি সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন এবং সৌদি আরব ও দেশটির আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন।
ডেনমার্কের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি সান্দ্রা ইয়েনসেন লান্ডিও সর্বশেষ হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি হুথিদের ইয়েমেনের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে সব হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
তিনি ইরানকে আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে উসকানি বা হুমকি থেকে বিরত থাকার এবং প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে হুমকি দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হুথিদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের দাবি করেন।
চীনের অবস্থান
চীনের প্রতিনিধি ফু ছং সরাসরি হুথিদের দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি পরিস্থিতির তীব্র অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বেসামরিক হতাহত ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিকে নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ ও অ-সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর সব ধরনের নির্বিচার হামলার নিন্দা জানানো উচিত।
ফু ছং বলেন, পরিস্থিতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা জরুরি। তিনি ইয়েমেন ও সৌদি আরব, উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান এবং সব পক্ষকে উত্তেজনা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ