তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান বলে মন্তব্য করে ইরানের এক প্রভাবশালী বিরোধী নেতা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগের বারের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আবার গড়ে তুলছে ইরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনে অবস্থিত ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরানের (এনসিআরআই) দফতরের উপপরিচালক আলিরেজা জাফরজাদেহ বলেন, নতুন প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের ‘২ ট্রিলিয়ন ডলারের’ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ দ্রুততর করেছে বলে জানানো হয়।
শাসকগোষ্ঠী স্পষ্টভাবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা বাড়িয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, তারা সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। তারা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি টিকিয়ে রাখতে এবং সেটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় বসেছে।
পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস প্রকাশিত নতুন স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইস্পাহান কমপ্লেক্সে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এটি ছিল ইরানের তিন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি, যেগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘মিডনাইট হ্যামারে’র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গত বছরের ২২ জুনের ওই অভিযানে মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বিত হামলা চালানো হয় ফোরতো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান স্থাপনায়।
হামলায় ক্ষতি হলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে—ইরান ওই স্থাপনার একটি টানেল কমপ্লেক্সের প্রবেশপথে মাটিচাপা দিয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নাতাঞ্জ স্থাপনাতেও নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে আরও দুটি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে।
জাফরজাদেহ বলেন, ইস্পাহানে এসব প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে তাদের সেন্ট্রিফিউজ কর্মসূচি পুনর্গঠন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রম।
এই নতুন তৎপরতার মধ্যেই জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয় ইরান।
এদিকে, বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে, তাহলে ‘খারাপ কিছু’ ঘটবে। এই আলোচনা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার লক্ষ্যে। তবে জাফরজাদেহর দাবি, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে এই আলোচনা কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল।
জাফরজাদেহ বলেন, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি পারমাণবিক আলোচনায় সম্মত হয়েছেন, যাতে পশ্চিমাদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের পরিণতি এড়ানো বা সীমিত করার জন্য শাসকগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ সময় পায়।
জাফরজাদেহ আরও দাবি করেন, শাসকগোষ্ঠী পারমাণবিক সক্ষমতায় অন্তত ‘২ ট্রিলিয়ন ডলার’ ব্যয় করেছে। তার ভাষায়, এই অর্থ ১৯৭৯ সালে ইরানে শাসনক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটির মোট তেল বিক্রির আয়ের চেয়েও বেশি।
তেহরান তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা রক্ষা করতে এবং দ্রুত পুনর্গঠন করতে চাইছে বলে জানান তিনি। তারা শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, জাফরজাদেহ সবচেয়ে বেশি পরিচিত ২০০২ সালে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আনার জন্য। এর ফলে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শন শুরু হয় এবং তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নজরদারি বাড়ে।
তিনি বলেন, পারমাণবিক আলোচনার সময় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়ে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর জোর দেওয়া এবং একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন করা—এগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, সর্বোচ্চ নেতার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
মরিয়ম রাজাভির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরান প্রথমবারের মতো নাতাঞ্জ, আরাক, ফোর্দোসহ শতাধিক স্থাপনা ও প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ করেছিল বলে জানান তিনি। শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক দমনপীড়ন সত্ত্বেও এই আন্দোলন এসব তথ্য উন্মোচন করে।
/ইউএমএইচ