সৌরজগতের বাইরে কোনো নক্ষত্রে বরফশীতল পানির অস্তিত্ব আছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। কারণ, বরফ বা পানির উপস্থিতি গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য প্রাণের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সহায়তায় বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছেন।
ওয়েব টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ ব্যবহার করে গবেষকেরা সৌরজগতের বাইরের তরুণ নক্ষত্র এইচডি ১৮১৩২৭ এর চারপাশে থাকা ধুলা ও পাথুরে কণায় গঠিত বলয়ে স্ফটিকাকার পানির বরফের স্পষ্ট উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার, কারণ এর আগে অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে এভাবে সরাসরি স্ফটিক বরফের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আমাদের সৌরজগতের ক্ষেত্রে জুপিটার ও শনির বহু উপগ্রহে বরফের অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া বামন গ্রহ প্লুটোতেও বিপুল পরিমাণ বরফ পাওয়া যায়। শনির বলয় কিংবা সৌরজগতের প্রান্তবর্তী অঞ্চল কুইপার বেল্ট–এও বরফময় বস্তু রয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এইচডি ১৮১৩২৭–এর বলয়ে যে ধরনের স্ফটিক বরফ পাওয়া গেছে, তা আমাদের সৌরজগতের এসব অঞ্চলের বরফের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল রয়েছে।
২০০৮ সালে স্পিৎজার স্পেস টেলিস্কোপ এই নক্ষত্র বলয়ে বরফের সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে তখনকার প্রযুক্তি এত সূক্ষ্ম ছিল না যে তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের উন্নত সংবেদনশীলতা ধুলো ও পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র বরফকণাও আলাদা করে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে এবার নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে, সেখানে স্ফটিকাকার পানির বরফ রয়েছে।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স ইউনির্ভাসিটি–এর গবেষক চেন সি জানিয়েছেন, নক্ষত্র বলয়ে বরফের উপস্থিতি মানে সেখানে গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া সক্রিয় এবং দ্রুতগতিতে চলছে। বরফসমৃদ্ধ ধুলা ও পাথুরে কণাগুলো একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে বৃহৎ আকার ধারণ করে, যা কোটি কোটি বছর পরে পাথুরে গ্রহে রূপ নিতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ওই গ্রহগুলোতে পানির উৎস হিসেবেও এই বরফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর জন্মের পর ধূমকেতু ও গ্রহাণুর মাধ্যমে যে পানি এসেছে, তার উৎসও ছিল বরফসমৃদ্ধ বস্তু।
প্রায় ৪৬০ কোটি বছর বয়সী আমাদের সূর্যের তুলনায় এইচডি ১৮১৩২৭ অনেক নবীন—এর বয়স আনুমানিক ২ কোটি ৩০ লাখ বছর। অর্থাৎ এটি গ্রহ গঠনের একেবারে প্রাথমিক ও অস্থির পর্যায়ে রয়েছে। নক্ষত্রটির চারপাশে পাথর, ধুলা ও বরফের খণ্ডগুলো ক্রমাগত একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। স্পেস টেলিস্কোপ সাইন্স ইনিস্টিতিউট–এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিন চেনের মতে, এটি অত্যন্ত গতিশীল একটি পরিবেশ। বরফখণ্ডগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে সূক্ষ্ম বরফকণা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর সেগুলিই ওয়েব টেলিস্কোপ শনাক্ত করেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নক্ষত্রটির কাছাকাছি অঞ্চলে বরফের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম—প্রায় ৮ শতাংশ। কারণ, নক্ষত্রের তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি বরফকে বাষ্পে পরিণত করে। তবে বলয়ের বাইরের দিকে তাপমাত্রা অনেক কম হওয়ায় সেখানে বরফের পরিমাণ ২০ শতাংশেরও বেশি। এই তাপমাত্রা ও দূরত্বভেদে বরফের তারতম্য ভবিষ্যৎ গ্রহগুলোর গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই আবিষ্কার কেবল একটি নক্ষত্র বলয়ে বরফের উপস্থিতি নিশ্চিত করেনি; বরং গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া এবং মহাবিশ্বে পানির বিস্তৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের তরুণ নক্ষত্র ব্যবস্থায় প্রাণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও নতুন করে মূল্যায়ন করা যাবে।
/ইউএমএইচ