গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় ব্যবধানে জয়লাভের পর দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে দীর্ঘ সময় নিষিদ্ধ থাকার পর আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস ধরে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমে বাধার কারণে দলটি মূল রাজনীতির বাইরে ছিল। তবে নির্বাচনের পর ধাপে ধাপে প্রতীকী কর্মসূচি এবং কার্যালয় পুনরায় উদ্বোধনের মাধ্যমে তারা পুনরায় রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। সেই সময়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর সারা দেশে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় দলীয় কার্যালয়গুলো ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয়। দলটির তৃণমূল নেতারা গোপনে ছড়িয়ে পড়েন, অনেকেই গ্রেফতার হন বা কারাগারে অবস্থান করেন।
২০২৫ সালের ১০ মে প্রশাসন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। আদেশে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার না হওয়া পর্যন্ত দলের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ একাধিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগ প্রায় ১৮ মাস রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। নির্বাচনে বিএনপির বড় জয় আওয়ামী লীগের নেতাদের পুনরায় সংগঠনকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইতিমধ্যে জামিন পেয়েছেন বরিশাল সদর আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ। প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর অবশেষে জামিন পেয়েছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক এমপি ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা দবিরুল ইসলাম। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বরিশাল মহানগর সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনসহ দুজন জামিন পেয়েছেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে এক ডজনের বেশি জেলা ও উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে দোয়া-মোনাজাত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টানানো ও স্লোগাব দিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ধানমণ্ডির ৩২-এ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা টাঙানো, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, পটুয়াখালীর দশমিনা, বরগুনার বেতাগী, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, শরীয়তপুর, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, হবিগঞ্জ, খুলনা, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, বরিশালের আগৈলঝাড়া ও নোয়াখালীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে দেখা গেছে। কোথাও তালা ভেঙে প্রবেশ, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আবার কোথাও ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কর্মসূচি ছিল স্বল্পসময়ের এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোথাও তারা সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি পালন করে দ্রুত সরে যাচ্ছেন, কোথাও প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ফিরে আসছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে কোথাও কোথাও দুয়েকটি জায়গায় গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে। খুলে দেওয়া কার্যালয় পুনরায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আজাদ জাহান শামীমের নেতৃত্বে গুটিকয়েক নেতাকর্মী দলীয় কার্যালয়ের সামনে পতাকা উত্তোলন এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে সোমবার ময়মনসিংহ নগরীর শিববাড়ী রোডস্থ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এ সময় দলীয় কার্যালয়টির সামনে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দেয়ালসহ ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এ ধরনের সক্রিয় কর্মকাণ্ডের কারণে দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয় বলেও জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৫ সালের ১০ মে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দলটির তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি দলটির নেতাকর্মীদের রাজনীতির মাঠে ফেরার কৌশলগত প্রচেষ্টার অংশ। যদিও এরই মধ্যে জেলা-উপজেলা খুলে দেওয়া কার্যলয়ের অনেকগুলোতেই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় এ ধরনের তৎপরতার মুখে স্থানীয় বিএনপি-সমর্থিত নেতাকর্মী ও জুলাই আন্দোলনকারীদের বাধা, ভাঙচুর বা পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অবশ্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং বিএনপির হাইকমান্ডকে নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তুলনামূলক কৌশলী ও নমনীয় অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
তারা বলেন, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে উপস্থিতি জানানোর কৌশল নিয়েছে। ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা দেখছে, বিএনপির প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর বা সহনশীল হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কৌশল।
এ ছাড়া সরকার গঠনের পর বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, ইসলামী দলগুলোর উত্থান বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক মাঠের বাইরে ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে। ফলে মাঠপর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক সহনশীলতার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অবশ্য সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার যে প্রসঙ্গ, সেটিকে আইনগতভাবে দেখা হবে। আমরা এটা চাইনি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখনও নিষিদ্ধ, তাদের অফিস খোলার কথা নয়। সেটা আইনিভাবে দেখা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগকে ফিরে আসাটা নির্ভর করছে সরকারি দল বিএনপির ওপর। যদিও এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আসতে পারে। তবে সরকার ধীরস্থিরভাবে এগোচ্ছে, এটা প্রথম কার্যদিবস থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণ চাইলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন। এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এমনকি বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেছেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাধান হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। জুলাইয়ের সঙ্গে জড়িতরাও এটা মেনে নেবে না। তবে ধীরে ধীরে দলটির কার্যক্রম চালানো উচিত। কিন্তু দ্রুত যদি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।