রাজধানীতে লাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও নির্ধারিত দামে তা মিলছে না। সরকার ভ্যাট কমিয়ে দাম কমানোর উদ্যোগ নিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বরং অধিকাংশ এলাকায়ই অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। লাইনের গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার শুরু করলেও সেটিই এখন বাড়তি আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু বাজারে সেই দামে সিলিন্ডার মিলছে না। ভোক্তাদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার কারণে অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
সরকার এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাস করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানায়, স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানির ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করে আমদানি পর্যায়ে এককভাবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে সামগ্রিক ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শিমুল হাসান টিউশনি করে সংসার চালান। বাসায় লাইনের গ্যাস নিয়মিত না থাকায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে তাকে। এতে মাসিক খরচ বেড়ে গেছে।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, লাইনের গ্যাসের বিল দিতে হয় ঠিকই, কিন্তু গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার রাখতে হয়েছে। এখন সেটিও নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি মাসে ১৯০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ।
আরও পড়ুন
শুধু শিমুল নন, রাজধানীর অনেক পরিবার একই সমস্যার মুখে পড়েছে। ধানমন্ডির শঙ্করের বাসিন্দা প্রান্ত তৌফিক সময়ের আলোকে বলেন, ১৮০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি। কোথাও কম দামে পাইলাম না। শুধু শুনি যে সরকার দাম কমাইছে। বাজারে কিনতে গেলে তো পাই না। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন ও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
রায়ের বাজারের সেফগ্যাস হোম ডেলিভারির এক প্রতিনিধি জানান, ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির ওমেরা সিলিন্ডার ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর আই গ্যাস ১৭৫০ টাকায় দেওয়া হচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় সিলিন্ডার সরবরাহকারী জসিম এন্টারপ্রাইজের মো. জসীম উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে বাসাবোর খুচরা বিক্রেতা নাদিম আহমেদ বলেন, তারা সরকারি দামেই বিক্রি করছেন এবং সরবরাহেও বড় সমস্যা নেই।
দামের এই অমিল নতুন নয় বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এজাজ হোসাইন। তিনি বলেন, সরকারি দামের তুলনায় বাজারে সবসময়ই ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি নেওয়ার প্রবণতা ছিল। কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তার মতে, শুধু তদন্ত নয়, ধারাবাহিক নজরদারি এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সরাসরি আমদানি ও বাজার ব্যবস্থায় যুক্ত করলে সরবরাহ স্থিতিশীল হবে এবং দাম নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সময়ের আলোকে বলেন, পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। সরকার শুল্ক, আমদানি কর ও ভ্যাট কমিয়েছে, ফলে দামও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, নতুন সরকার তদারকির কথা বলেছে, এবং সরকার যদি কার্যকরভাবে বাজার মনিটরিং করে, তা হলে নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আমাদের মূল দাবি হলো এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেই দামে যেন এলপিজি বাজারে পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, মূল্য কারসাজির পেছনে শুধু একটি পক্ষ নয়; আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা, তিন পক্ষই জড়িত। কেউ এককভাবে দায় এড়াতে পারে না। অনেক মালিক দাবি করেন তারা দাম বাড়াচ্ছেন না, কিন্তু সরকার দাম কমানোর পরও যদি ডিস্ট্রিবিউটর বা খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তাদেরই। খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে পণ্য কেনার প্রমাণও দেখাচ্ছেন, যা সরবরাহ চেইনের ভেতরকার সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, সবাই একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে, অথচ পুরো বিষয়টি একটি সমন্বিত চক্রের মাধ্যমে ঘটছে এবং এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল জব্বার সময়ের আলোকে জানান, গত বৃহস্পতিবার তাদের বৈঠক হয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। আলোচনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের কোনো উদ্যোগে তাদের আপত্তি নেই।
তিনি বলেন, সরবরাহ চেইনের যেসব ব্যক্তি অনিয়ম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সন্তোষজনক রয়েছে। তাই খুচরা পর্যায়ে দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অতীতেও খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে সামান্য বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। কারণ খুচরা বিক্রেতারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের আওতায় নেই। তবে গত নভেম্বর ও বিশেষ করে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে আমদানি কম হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বাজারে অভিযান চালালে অনেক সময় বাজারে নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি বেড়েছে এবং মার্চেও আমদানি ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বৈঠকও হবে।
তিনি জানান, গত সপ্তাহের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ১৫০০ টাকায় এলপিজি অফার করা হচ্ছে। ১৮০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা কয়েক দিন আগে তার দফতরে জানানো হয়। এ কারণে বটলিং কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। উৎপাদক ও বটলারদেরই এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এএডি/