ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের তৃতীয় দিনে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে, যা দুবাই থেকে সাইপ্রাস পর্যন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে।
গত শনিবার যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানসহ প্রায় অর্ধশত শীর্ষ নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। এর জবাবে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলের পাশাপাশি বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানে।
যুদ্ধের এই তিন দিনে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, যৌথ হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় ১৮০ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে এবং রাজধানীসহ উত্তরাঞ্চলে আরও তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া তেহরানের নিলুফার স্কোয়ারে ২০ জন, সানন্দাজ শহরে দুইজন এবং মেহরান শহরে একটি সীমান্ত রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে হামলায় ৪৩ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে এই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে চীনও, যাদের একজন নাগরিক ইরানে নিহত হয়েছেন বলে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ও আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরানে অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত চারজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের বেইত শেমেস শহরে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নয়জনসহ মোট ১০ জন ইসরায়েলি নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চল ও বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতেই ২০ জনের মৃত্যু ঘটে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলায় বেশ কিছু বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলায় পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশের তিনজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। কুয়েতে ইরানি হামলায় একজন নিহত হয়েছেন এবং মিনা আল-আহমাদি রিফাইনারিতে ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন কর্মী আহত হয়েছেন। বাহরাইনের সালমান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একটি বিদেশি জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং সেখানে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এছাড়া ওমান উপকূলে একটি তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরকবোঝাই নৌকা দিয়ে হামলায় ইঞ্জিন রুমে বিস্ফোরণ ঘটে একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। ইরাকে ইরান-সমর্থিত পিএমএফের সদর দপ্তরে ইসরায়েলি হামলায় আরও চারজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিশ্র বার্তা দিয়েছেন। তিনি ফক্স নিউজ ও ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন যে, খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার অপারেশন সফল হয়েছে এবং সব লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই হামলা চলবে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যুদ্ধ চার সপ্তাহ বা তার কম সময় স্থায়ী হতে পারে এবং এটি বিশ্বের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ভিন্ন শঙ্কা প্রকাশ করছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ট্রাম্প ইরানে সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখলেও ইরানের বিশাল জনসংখ্যা ও পরমাণু সক্ষমতা এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের মতে, খামেনির মৃত্যু সরকারকে টলিয়ে দিলেও কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা ঐতিহাসিকভাবে সফল হয়নি।
দ্য আটলান্টিক ও দ্য টেলিগ্রাফ সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌবাহিনীর মহড়া বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি বিশেষ করে বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের দুর্ভোগের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
আটলান্টিক কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের ফলাফল পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আমেরিকা একটি দীর্ঘ ও অন্তহীন সংঘাতের পথে পা বাড়াতে পারে। একদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের ঘরোয়া রাজনীতি এবং বিদেশের যুদ্ধে জড়ানোর অনাগ্রহ তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্ব শান্তি ও অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
সময়ের আলো/আরবিএন