ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের তথ্য গোপনের নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জর্ডানে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার আগের সপ্তাহে আরও তিনটি হামলা চালিয়েছিল ইরান। ওইসব হামলায় বহু মার্কিন সেনা আহত এবং বেশ কয়েকটি সামরিক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পেন্টাগন তা সম্পূর্ণ চেপে গেছে বলে বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।
পেন্টাগনের এই পদক্ষেপ মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’ বা কৌশলগত নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনগণের কাছে যুদ্ধের সঠিক তথ্য পৌঁছানোর সাংবিধানিক দায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে আবার সামনে এনেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত সপ্তাহে ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালানোর পর দাবি করেছিল, তারা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার প্রতিশোধ নিচ্ছে। কিন্তু জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের সফল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়টি তারা পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, আহত সেনারা দ্রুত দায়িত্বে ফিরে এলে সেই তথ্য প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা সেন্ট্রাল কমান্ডের নেই। তা ছাড়া, এসব তথ্য প্রকাশ করলে ইরান মার্কিন ঘাঁটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যেত, যা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ নিয়ে পেন্টাগন জনসাধারণের কাছে তথ্য দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। গত মে মাসের পর বড় কোনো ব্রিফিং করা হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন শুধু সেনানিহতের খবরই লুকাচ্ছে না, বরং এই যুদ্ধ মার্কিন অস্ত্রের মজুদ কীভাবে শেষ করছে এবং ইরান কীভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি পুনর্গঠন করেছে, সেই সত্যও গোপন করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর এ পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের আগের হিসাব অনুযায়ী ৪০০-এর বেশি সেনা আহত হয়েছেন। অন্যদিকে এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সেনারা দেশের সেবায় প্রাণ দিয়েছেন এবং ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়ার লক্ষ্যেই এই যুদ্ধ চলছে। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই ক্ষতি আমেরিকার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে’ লিপ্ত রয়েছে। তেহরানকে এখন এই সংঘাতের পরিণতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন সোমবার জানিয়েছে, একটি প্রেসিডেন্সি বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান বলেন, বাস্তবতা হলো- ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে এবং এই প্রতিরোধের স্বাভাবিক ফলাফল মেনে নিতে হবে।
এদিকে ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধ থামানোর কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত এই অঞ্চলে নতুন নতুন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ লেখেন, আমেরিকানরা এই অঞ্চলে নতুন সামরিক সরঞ্জাম আনা অব্যাহত রেখেছে এবং দাবি করছে তারা যুদ্ধ থামাতে চায়। তারা ধরে নিয়েছে আমাদের বুদ্ধিমত্তা তাদের নিজস্ব আইকিউর মতোই কম।
গালিবাফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিচারিতাকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, আমেরিকানদের এই খেলাগুলো চিনে ফেলার মতো দক্ষতা আমরা অর্জন করেছি এবং সেই ভিত্তিতেই আমরা নিজেদের প্রস্তুত করেছি। মুখের দাবি অবশ্যই কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে, কাজের সঙ্গে দাবির কোনো বৈপরীত্য থাকা চলবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সম্প্রতি সামরিক তৎপরতা ও যুদ্ধবিরতির দাবির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং পরমাণু চুক্তির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওয়াশিংটনের নীতিকে দ্বিমুখী বলে অভিহিত করেন।
গালিবাফ জোরালো ভাষায় বলেন, ইরানের কর্মকর্তারা এখন ‘আমেরিকানদের এসব খেলা বা চাল শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে।’ আমেরিকার উদ্দেশ্যে তিনি বার্তা দেন, মুখে শান্তি বা যুদ্ধবিরতির দাবি করলেই হবে না, কাজের মাধ্যমে সেটির প্রমাণ দিতে হবে। কারণ, তাদের বর্তমান পদক্ষেপগুলো তাদের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি