ইরানের সমর্থনপ্রাপ্ত ইয়েমেনের হুথিরা সোমবার ঘোষণা দিয়েছে যে তারা সৌদি আরবের ওপর পূর্ণাঙ্গ নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধে নতুন এক ফ্রন্ট তৈরি হলো। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক যাতায়াতের ওপর হুমকি আরও বেড়ে গেল।
হুথিদের এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই ক্রমবর্ধমান হামলার চক্র ভেঙে কূটনৈতিক পথে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সংঘাতে ইতিমধ্যেই গত মাসে স্বাক্ষরিত অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছে। হুথিদের বিবৃতির পর কিছুক্ষণের জন্য বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলেও শিগগিরই কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার আশায় তা আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। আলজাজিরা ও এপি।
হুথিদের এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ইরানের চাপ। তেহরান বারবার বলছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎ ও কৌশলগত অবকাঠামোতে হামলা চালাতে থাকে, তবে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় ৭ শতাংশ কমে যাবে এবং সৌদি আরবের অধিকাংশ তেল রফতানি পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের পরিবহন প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে- এই নতুন সংকট তা আরও তীব্র করে তুলবে।
হুথি বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি শত্রু যেভাবে ইয়েমেনের ওপর অন্যায় ও নিপীড়নমূলক অবরোধ চালিয়েছে, তার জবাবে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে আমরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করছি। এ বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এই উত্তেজনার মাঝেই মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরানের কাছে মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তাবটি গত মাসের অস্থায়ী চুক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনও সক্রিয় রয়েছে। তবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তানের দুটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইসলামাবাদ সফর করেছেন এবং পাকিস্তানকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেও পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র পরপর নবম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন শহর ও কৌশলগত স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এই হামলার লক্ষ্য ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস করা।
এই হামলার জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়েছে। তারা জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে মার্কিন যুদ্ধবিমান, কুয়েতের আল-আদিরি ক্যাম্প ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের ভেতরে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েও এই হামলাকে যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করছেন। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ায় তাদের স্মরণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব পড়ছে সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক চলাচলের ওপরও। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বিবৃতি অনুযায়ী দুটি তেলবাহী জাহাজ অনিরাপদ পথ দিয়ে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে বিস্ফোরণের শিকার হয়। রোববারও একই এলাকায় দুটি জাহাজের দুর্ঘটনার কথা জানিয়েছিল তারা- তবে এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। ওমান উপকূলের কাছে অজানা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আরেকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও জাহাজটি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ভাসছে, তবে ক্রু সদস্যরা নিরাপদ রয়েছেন বলে ব্রিটিশ সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা জানিয়েছে।
মার্কিন হামলায় ইরানের তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বান্দর মাহশাহর ও বান্দর ইমাম খোমেনি শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এদিকে কুয়েতে পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো পানি বিশোধন কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে আগুন লেগে যায়। কুয়েত সরকার একে নাগরিকদের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ বলে অভিহিত করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশের পানীয় জলের চাহিদা এই ধরনের প্রকল্প থেকে পূরণ হয়- যা বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করে।
ইরানের অভিযোগ, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব একটি পানি বিশোধন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে; তাই তারাও প্রতিশোধ হিসেবে এ ধরনের স্থাপনা লক্ষ্য করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লেও উভয় পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘যতদিন ইরান আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে, ততদিন আমাদের জবাব দিতেই হবে। তবে কূটনৈতিক সমাধানের পথ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবসময়ই উন্মুক্ত।’
একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘায়ী জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাব তাদের কাছে পৌঁছেছে এবং আলোচনার দরজা এখনও বন্ধ নেই। ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাব আমাদের কাছে এসেছে,’ বলেন তিনি।
এই চলমান সংঘাতে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। হুথিদের নতুন অবরোধের ঘোষণা এই সংকটকে আরও বড় করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে, যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি