অর্থনীতি ভালো করতে ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি দিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তারা

2026-03-05T05:41:36+00:00
2026-03-05T05:41:36+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
অর্থনীতি ভালো করতে ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি দিতে হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬, ৫:৪১ এএম   (ভিজিট : ৬৩)
প্রতীকী ছবি
ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বর্তমানে গড় ঋণখেলাপির হার ৩৬ শতাংশ ও সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই টাকাগুলো কারা নিয়েছে? যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হস্তে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘লুকিং ইনটু বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট : প্রায়োরিটি ফর দ্য নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট ইন দ্য শর্ট টু মিডিয়াম টার্ম’ শীর্ষক রাউন্ড টেবিল বৈঠকে ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজীজ রাসেল, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম। 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পলিসি রিসার্চের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সিদ্দিক আহমেদ, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 

ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, সরকার বর্তমানে ব্যাংক থেকে ৩২.১৯ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে, সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। মানে আমার জন্য টাকা নেই বা থাকলেও আমি নিতে পারছি না। গ্যাস কানেকশন নেই। সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছেÑ বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে যা নন-প্রোডাক্টিভ খাতে। রাজস্ব আদায় কমছে। ছয় মাসেই ৩৬ হাজার কোটি টাকা টার্গেটের চেয়ে কম রাজস্ব এসেছে। গত অর্থবছরের জিডিপি ৪.২২ থেকে ৩.৯৭ নেমে এসেছে। বিনিয়োগ নেই, ভ্যাট নেই, ইনকাম ট্যাক্স নেই, কাস্টমস ডিউটি নেই, তা হলে উন্নয়ন হবে কীভাবে?

এনার্জিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, হাজার হাজার গ্যাস সংযোগের আবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তিতাসে পড়ে আছে, কিন্তু নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। গ্যাস না পেয়ে শিল্প চালাতে আমাকে সিএনজি থেকে গ্যাস নিয়ে বয়লার চালাতে হয়, ডাবল দাম দিয়ে। সরকার যদি চুলার গ্যাস বন্ধ করে এলপিজিতে দেয়, তা হলে সেই গ্যাস শিল্পে দেওয়া যায়।

তিনি দাবি করেন, ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে যাচ্ছে এবং গুড গভর্ন্যান্সের বিকল্প নেই। আইনের শাসন যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারলে, সরকারি ব্যয় কমাতে না পারলে সংকট কাটবে না। সরকারি ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়ে এ কে আজাদ বলেন, এত মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর আদৌ দরকার আছে কি না তা পর্যালোচনার জন্য কমিশন করা উচিত।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকারের অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য হলো গতানুগতিক ভোগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা।

উপদেষ্টা তার বক্তব্যে সরকারের ম্যান্ডেটের পাঁচটি ভিত্তিমূল তুলে ধরেন, যার মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অন্যতম। তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণের যে পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা অর্থনীতিকে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই সংকট উত্তরণে সরকার অপচয় রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে আমরা ‌‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি, যা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে সহায়তার ক্ষেত্রে অপচয় কমাতে সাহায্য করবে। এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংস্কার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বর্তমানে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করার ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ৩৫.৭ শতাংশে দাঁড়ালেও ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করায় তা কিছুটা কমেছে। তিনি খেলাপি ঋণ কমানো, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার ওপর জোর দেন। তার মতে, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আইনি সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে একটি ‘সরবরাহজনিত সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় এবং বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে বাজারে মজুদদারি ও সিন্ডিকেট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখার তাগিদ দেন ফাহমিদা খাতুন।

বৈদেশিক রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের স্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে ২১.৭৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করছে। রফতানি খাতে কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত রফতানি বহুমুখীকরণের জাতীয় কৌশল গ্রহণের সুপারিশ করেন তিনি।

ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, কেবল ভালো নীতি  গ্রহণ করলেই হবে না,  সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। তার মতে, ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অতিরিক্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যা সরকারের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।

 তিনি সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ডিজিটালাইজ করার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এটি কেবল আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ না রেখে সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে কাজের দক্ষতা বাড়বে এবং অপচয় কমবে। 
এখন সরকারের কাছে পৌঁছানো যায়, কিছু দিন আগেও পৌঁছানো যেত না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নতুন সরকারের প্রথম ১৫ দিনে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা ‘ইতিবাচক’। গত দেড় বছর ক্ষমতায় থেকেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দেশের কোনো ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স তো মাত্র ১৫ দিন। আমার ব্যক্তিগত এক্সপিরিয়েন্স ও অ্যাসোসিয়েশনের এক্সপিরিয়েন্স পজিটিভ। পজিটিভ এ কারণে যে- প্রথমত এখন সরকারের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে, কিছু দিন আগেও পৌঁছানো যেত না।

সরকারের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে থাকা ডি-রেগুলেশন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে- এমন আশা প্রকাশ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সরকারের মেনিফেস্টোর মধ্যে অন্যতম ছিল ডি-রেগুলেশন। ডি-রেগুলেশন নিয়ে সরকার যদি প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে তা হলে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   অর্থনীতি  ভালো  ব্যাংক  শাস্তি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: