ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি তার বিভিন্ন বক্তব্য দলের ভেতরে-বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সাধারণ মানুষও সমালোচনায় মুখর।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ ফর্ম তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে—এগুলো সংবিধানে নেই।’
এ ধরনের বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। বিশেষ করে গণভোটে হ্যাঁ ভোটের সমর্থকরা এটি ভালোভাবে নেননি।
ওই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ যদি গঠন করতে হয়, সেটি জাতীয় সংসদে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার মাধ্যমে করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। সংবিধানে সংশোধনী আনলে সেটা সংবিধানে ধারণ করার পরে জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়া হবে কি না, কারা শপথ গ্রহণ করবেন, কে করাবেন, কোন ফর্মে করাবেন, এগুলো সব ধারণ করতে হবে। এগুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আলাপ আলোচনার বিষয়।’
এদিকে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটা বলেছেন সেটাই হবে এবং দ্রুত তদন্ত করা হবে। এছাড়া যদি প্রয়োজন মনে হয়, তদন্ত করতে হবে। কারণ বিষয়গুলো আদালতে আছে।’
ফখরুলের এ বক্তব্যের পর জুলাই আন্দোলনে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে ‘ইতোপূর্বে’ কোনো বক্তব্য দেননি বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি কিছু বলেছে এ ব্যাপারে? উনি আমার বরাত কেন দিলেন, আমি জানি না। আমি তো ইতোপূর্বে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিইনি। মহাসচিব কী বলেছেন, আমি জানি না।’
সরকারের দুজন সিনিয়র মন্ত্রীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ঘিরে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে, সোমবার (২ মার্চ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ আনা যেতে পারে, তবে তার আগে বিদ্যমান সংবিধানে নেই এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানে সংশোধনী এনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আনা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে সংবিধানে নেই এমন কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে সংবিধানে এই পরিষদের বিষয়ে কিছু নেই। যারা শপথ নিয়েছেন, সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে অসাংবিধানিক কোনো কিছু আমরা সংসদে উত্থাপন করতে পারি না।’
সালাহউদ্দিন আহমদের এসব বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা–সমালোচনাও হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেছেন, সালাহউদ্দিনের এ ধরনের বক্তব্য শুধু দলেরই না বরং সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিএনপির ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করছে। দলের নেতারা মনে করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ও জনমতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের ভাষ্য, বিষয়গুলো নিয়ে আরও সমন্বিত ও স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্য শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই ‘সাংবিধানিক কিছু’ বানিয়ে ফেলতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে বিএনপির সাথে জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানগত পার্থক্য পরিষ্কার এবং এখন দেখার বিষয় হবে এই পার্থক্য কতদূর অগ্রসর হয়।’
তিনি বলেন, ‘এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির মধ্যে ইতস্তত বোধটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ফলে জামায়াত ও এনসিপি এটি নিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করলে এটা ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে।’
আরেক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, ‘জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান আগে থেকেই পরিষ্কার, কারণ দলটি আগেই বলেছে তাদের ইশতেহার নির্বাচনে জনরায় পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে তারা।’
অপরদিকে নতুন সরকার গঠনের আগেও সালাহউদ্দিনের একাধিক বক্তব্যে বিভ্রান্তি ও আলোচনার সূত্রপাত হয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটার দিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ঢাকা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের খণ্ডিতাংশ গণমাধ্যমে ও ফেসবুকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের শিরোনামে বলা হয়, তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেছেন। তবে তার পুরো বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, তিনি এই ধরনের কিছু হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে, সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং এগুলো পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রর অংশ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বক্তব্যের আগে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘নির্বাচনের আর বেশি দিন নেই। এ সময় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিভিন্ন জায়গায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে অনেকে নিহত হচ্ছে। গতকালও স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নিহত হলো। এই বিষয়টি একটু বলবেন?’
জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। গতকালকের ঘটনাও তারই অংশ। এটা হতে পারে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির কিছু কিছু ষড়যন্ত্র এখনো তারা চালু রেখেছে, যাতে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, কণ্টকাকীর্ণ করতে পারে। গণতন্ত্রের উত্তরণের পথটাকে সহজতর না করতে পারে। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা কখনো সফল হবে না। এদেশের মানুষ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দল ও সরকারে যারা দায়িত্বশীল জায়গায় আছেন, তাদের বুঝে-শুনে বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন। বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, সমালোচনা তৈরি হয়—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কৌশলী ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/কেএইচও