চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হওয়ার সময় তাইওয়ান নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দেয়। বেইজিংয়ের বিশাল ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’এর পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং প্রতিরক্ষা ব্যয় সাত শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে তাইওয়ান প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথাও বলেন।
তিনি জানান, চীন বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং তাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
এমন ঘোষণায় তাইওয়ান, ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুত কি কমে যাচ্ছে? এই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
বিশ্লেষকদের একটি আশঙ্কা ছিল যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যস্ত থাকে, তাহলে চীনের নেতা সি চিনপিং হয়তো তাইওয়ানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির সঙ্গে ‘পুনঃএকত্রীকরণকে’ তারা ঐতিহাসিক দায়িত্ব বলে মনে করে।
তবে বাস্তবে কিছু ঘটনা উল্টো ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, অন্তত স্বল্পমেয়াদে ইরান যুদ্ধই তাইওয়ানের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতার শক্তিশালী প্রদর্শন করেছে।
সংঘাতের প্রথম চার দিনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এর মধ্যে বহু জাহাজ ধ্বংস করা হয়। এমনকি ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজও ডুবিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানের খবরও সামনে আসে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সক্ষমতার শক্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা চীনের সামরিক নেতৃত্বকে ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সেনাবাহিনী গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে কোনো বড় যুদ্ধে অংশ নেয়নি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত।
আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। ইরান চীনের কাছ থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম কিনেছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সংঘাতের সময় সেসব অস্ত্র কতটা কার্যকর ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে চীনের সামরিক প্রযুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাও কিছুটা আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে কূটনৈতিকভাবেও চীন কিছুটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। এতদিন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরলেও ইরান সংঘাতের সময় তারা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে তাদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চীন চাপের মুখে পড়তে পারে। চীনের তেলের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তাইওয়ান প্রশ্নেও নতুন হিসাব দেখা যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, চীন এখন খুব দ্রুত কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে না। কারণ তারা ধরে নিয়েছে, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এদিকে চীনের ভেতরেও সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান চলছে। দুর্নীতির অভিযোগে বহু উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো ও যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিই বদলাচ্ছে না, এর প্রভাব পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতেও পড়ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাতের ফলে অন্তত সাময়িকভাবে তাইওয়ানের ওপর চীনের সম্ভাব্য সামরিক চাপ কিছুটা কমে যেতে পারে।
সময়ের আলো/আরবিএন