ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলমান আগ্রাসন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে কোনো চুক্তি হবে না; কিন্তু ইরান তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান বলেছে তারা আত্মসমর্পণ করবে না। শনিবার ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন ইরান যদি তার দাবি না মানে তা হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্তিশালী ও কঠোর হামলা চালাতে প্রস্তুত। এই হুঁশিয়ারি যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে তার হামলার ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছে। তারা বলেছে তারা ওই দেশগুলোর দ্বারা আক্রান্ত না হলে নতুন করে আর কোনো হামলা চালাবে না। এদিকে যুদ্ধের তীব্রতা ও বিস্তৃতি ক্রমেই বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের অবস্থান : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ভাষণে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শর্তহীন আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি কড়া বার্তা দিয়েছেন যে এই দাবি না মানলে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী তাদের প্রচেষ্টা দিয়ে যুদ্ধ জারি রাখবে। এই প্রস্তাবের মাঝেই ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে মেনে নেবেন কিন্তু সেটার শর্ত মানতে হবে। একই সঙ্গে গতকাল রাতেই বড় হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন তিনি।
তবে ইরান আত্মসমর্পণের দাবিকে ‘স্বপ্ন বা অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন যে তারা আত্মসমর্পণ করবে না এবং নিজের স্বার্থে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে কেউ চাপ দিতে পারবে না। তিনি বলেছেন, ইরান শান্তি চায়, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয় এবং তারা বলেছে যে যুদ্ধের এই পরিস্থিতি তাদের দমন করার পথ নয়।
হামলা-পাল্টা হামলা : ইরান যুদ্ধের শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের যৌথ বিমান হামলা শুরু করে। তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও র্যাডারভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানেছে। এই হামলায় বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যে ব্যাপক আঘাত করা হয়েছে; এ পর্যন্ত ১,৩৩২ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে বলে ইরানের জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।
ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের হামলা চালিয়েছে। তারা আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। এই হামলার ফলে আবুধাবি ও দুবাইয়ে কিছু ছোট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আহত হয়েছে কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তি। শর্ত সাপেক্ষে ইরান এই হামলা থামাবে বলেও জানিয়েছে। তারা বলেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিবেশীরা হামলা করে না, তারা আর কোনো আক্রমণ করবে না। এই অবস্থান একটি অস্বাভাবিক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক পরিস্থিতি : ইরানি হাসপাতাল ও জরুরি পরিষেবাগুলো অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। বেসামরিক এলাকায় বহু ঘরবাড়ি ও ভবন ধ্বংস হয়েছে এবং মরদেহ বহন ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে অত্যন্ত সংকটের সঙ্গে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে যুদ্ধের এই অবস্থা চলতে থাকলে মানুষের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের পরিধি আরও বাড়বে, এবং শিশু ও বৃদ্ধদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
গালফ অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি : ইরানের হামলার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত ৩ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছে বলে সরকারি তথ্য এসেছে, আর বিভিন্ন স্থানে স্থাপনা ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওমানে ইরানের হামলায় এক বিদেশি কর্মী নিহত এবং আরেকজন আহত হওয়ার খবর এসেছে, তেল ট্যাঙ্কারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বন্দরগুলোতে ক্ষতি ও পরিবহনে বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক চাপ : রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই সংঘাতকে ‘সশস্ত্র আমেরিকান‑ইসরায়েলি আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং কূটনৈতিক সমাধান ও ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কুয়েত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলো আকাশসীমায় সতর্কতা জারি করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে নিরাপত্তা সতর্কবার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য যুদ্ধের কোনো সরাসরি অভিযানে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা করেছে এবং বলেছে তারা মার্কিন বিমানঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে কোনো হামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি। জাতিসংঘ মানবাধিকার তদন্ত দলও এই সংঘাতের অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং ইরান‑মার্কিন‑ইসরাইলি আক্রমণের জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
অর্থনৈতিক ও বাজার প্রভাব : যুদ্ধের ফলে হুরমুজ প্রণালি বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে তেলের দাম বিশ্ব বাজারে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি দুর্বলতার মুখে পড়ে যেতে পারে।