মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে যে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে এটি আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্ব রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই সামরিক হামলা অপ্ররোচিত, অপ্রয়োজনীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। একই সঙ্গে তারা যুক্তি দেন, ইরানের পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে এই সংঘাতকে সাধারণত নিরাপত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নে ব্যাখ্যা করা হলেও প্রকৃত বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
পারমাণবিক প্রশ্ন ও দ্বিচারিতার অভিযোগ : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রধান অভিযোগ, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এই যুক্তির মধ্যে বড় ধরনের দ্বিচারিতা রয়েছে। কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (যাকে সাধারণত এনপিটি বলা হয়) স্বাক্ষর করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের দাবিও মেনে নিয়েছে।
২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল (যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা) সেটিও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রই একতরফাভাবে সরে যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃতপক্ষে পারমাণবিক অস্ত্রধারী একমাত্র রাষ্ট্র হলো ইসরাইল, যদিও দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করে না এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আওতাতেও নেই। এই প্রেক্ষাপটে যদি পারমাণবিক অস্ত্রই মূল উদ্বেগ হয়, তা হলে অস্ত্রবিহীন একটি দেশকে আক্রমণ করা এবং অস্ত্রধারী একটি রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা কতটা যৌক্তিক।
রাজনৈতিক যুক্তি না বাস্তব উদ্বেগ : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করার আরেকটি যুক্তি হিসেবে পশ্চিমা কিছু রাজনৈতিক মহল মানবাধিকার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে। তবে এটি রাজনৈতিক প্রচার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিজেদের মানবাধিকার রেকর্ডের কারণে এই যুক্তি খুব শক্তভাবে দাঁড় করাতে পারে না। ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে দখল, বর্ণবৈষম্য, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গোপন অপারেশনের মাধ্যমে ব্যাপক মানবিক ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় যেসব রাষ্ট্র নিজেরাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত, তারা অন্য দেশের মানবাধিকার রক্ষার নামে সামরিক হামলা চালালে সেটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়।
যুদ্ধের পেছনের রাজনৈতিক লক্ষ্য : ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে তাদের প্রভাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইরানকে এই পরিকল্পনার প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হয়।
কারণ দেশটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্বাধীন অবস্থান ধরে রেখেছে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা; যাকে সাধারণত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বলা হয়।
নির্বাসিত নেতৃত্ব ও বিকল্প ক্ষমতার পরিকল্পনা : এই বিতর্কের মধ্যে একটি নাম বারবার সামনে আসছে; রেজা পাহলভি। তিনি ইরানের সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে শাহের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে সেই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে এবং ইরানে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
রেজা পাহলভি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। কিছু মহলে তাকে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হলেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের অভ্যন্তরে তার জনপ্রিয়তা খুব সীমিত। সমালোচকদের মতে, ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে বিদেশি শক্তি কোনো দেশে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধের বৈধতা : এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না; যদি না তা আত্মরক্ষার জন্য হয় অথবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকে।
এ ছাড়া ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার কেবল তখনই প্রযোজ্য যখন কোনো রাষ্ট্র সরাসরি সশস্ত্র হামলার শিকার হয়। সমালোচকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এই দুই শর্তের কোনোটিই পূরণ করে না। তাই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি ‘আগ্রাসনের অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নুরেমবার্গ বিচারের সময় এই ধরনের আগ্রাসী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, তারা সশস্ত্র হামলার শিকার হওয়ায় আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে।
সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ : আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনা বা বিপজ্জনক শিল্প স্থাপনাকে আক্রমণ করাও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এমন স্থাপনায় হামলা হলে তা শুধু সামরিক নয়, পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচও