চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় আট বছর থেকে দুই পা বিকল, চোখ দুটিও অন্ধ, সেই ইউনুস আলীকে দৈনিক সময়ের আলো প্রিন্ট ও মাল্টিমিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশের পর তার পাশে দাঁড়ালেন, নাটোর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা শেখ এমদাদুল হক আল মামুন। শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ইউনুস আলীকে নিয়ে গত ১ জানুয়ারি সময়ের আলোতে ‘অন্ধ চোখ-বিকল পা নিয়েও সফল উদ্যেক্তা ইউনুস’ এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়।
ওই রিপোর্টটি শেখ এমদাদুল হক আল মামুন নজরে আসলে দৈনিক সময়ের আলোর স্থানীয় প্রতিবেদক সুফি সান্টুর সাথে রোববার দুপুরে যোগাযোগ করে ইউনুস আলীর বাসায় ছুটে যান এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। এক পর্যায়ে ইউনুস আলীর খামারে সব কোয়েল মারা যাওয়ার কথা শোনে তাদের আর্থিক সমস্যা সমাধান ব্যবসায় আবার ঘুরে দাড়াতে তিনি ওই পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন। এর শেখ এমদাদুল স্থানীয় কাঁঠাল বাড়িয়া মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেন।
শেখ এমদাদুল হক বলেন, ওনাকে পাশে পেয়ে সত্যিকার অর্থে ভালো লাগছে। যে লোকটার দুই পা অচল, চোখ দুইটাও অন্ধ, সেই লোক কারো কাছে হাত পেতে নয়, ভিক্ষা করে না, নিজে ব্যবসা করে চলে। শুধু তাই নয় তার মা-বোন ভাগনে তাদের কে দেখে।
সমাজে তাদের অবহেলা না করে মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করলে তারাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন দেশের অর্থনীতিতে।
আরও পড়ুন
দু-অন্ধ চোখ-বিকল পা নিয়ে হাতের উপর ভর করে হাটে-বাজারে কোয়েল পাখি বিক্রি করে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে ফেলেছেন তিনি। আজ তিনি স্বাবলম্বী। সমাজে অনেক কোটিপতি-শিল্পপতি রয়েছেন, তাদেরকে পিছিয়ে পরা এসব জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো উচিত। বিশেষ করে করে আল্লাহ-তালায়া যাদেরকে অনেক ধন-সম্পদ দিছে। তাহলে ইউনুস আলীর মত অন্যরাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এ্যাড. শাখাওয়াত হোসেন আজম বলেন দৈনিক সময়ের আলো প্রতিবেদন দেখে সাবেক পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র এমদাদুল হক বেশ অনেক দিন থেকে ওই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করে আসছিলেন সদ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবাই ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আসা হয়নি। আজ এসে তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলো এবং যারা বিত্তবান রয়েছেন আগামীতে এই ধরনের যারা সমাজে রয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়ানো আহবান জানান।
জানা যায়, নাটোর শহরতলির রথবাড়ী রাজাপুর মহল্লায় মা-বোনসহ চার সদস্যের সংসার ইউনুস আলীর। তার বাবা আবুল কালাম আজাদ দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদাভাবে বসবাস করেন। তাদের খোঁজ-খবর রাখেন না।
একটা সময়ে ইউনুসের মা রাজিয়া বেগম তার তিন কন্যা ও দুই ছেলেকে নিয়ে শহরের ঝাউতলা বস্তিতে থেকে বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবনযাপন করেছেন। ইউনুস আলী জন্মগতভাবে স্বাভাবিক হলেও মাত্র আট বছর বয়সে স্থানীয় শের-ই-বাংলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পেটের ব্যথা ও বমি নিয়ে শহরের মাদরাসা মোড়ে এক চিকিৎসকের কাছে যান। সেই চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় আজ তিনি প্রতিবন্ধী। দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও বৃদ্ধ মা, বোনসহ চার সদস্যের সংসারে হাল ধরতে হয়েছে তাকে। প্রতিবন্ধী ভাতার মাত্র ১৫শ টাকায় ৮০টি কোয়েল পাখি দিয়ে প্রায় ৮ বছর আগে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ইউনুস। আজ তিনি হয়েছেন ইউনুস কোয়েল ফার্মের মালিক। কিন্তু হঠাৎ করে গত শীতে তার খামারের সব পাখি মারা যায় এতে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউনুস।
আরও পড়ুন
জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই ইউনুসের। তার কথায়, আমি এখানে ৭-৮ বছর ধরে কোয়েল পাখির ব্যবসা করি। প্রথমে ৮০টি পাখি দিয়ে এ ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে এক থেকে দেড় হাজার পাখি আছে আমার। এই কাজে আমার মা ও বোন অনেক সহযোগিতা করে।
ইউনুস আরও বলেন, অনেকে আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। তারা আমার হাতে ছেঁড়া-ফাটা টাকা ধরিয়ে দেয়। আবার অনেকে কম টাকা দিয়ে বেশি টাকা দিয়েছে বলে দাবি করে। এসব কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এই ভাবে ব্যবসা করে আসছিলাম কিন্তু পাখি মরে গিয়ে ক্ষতির মুখে পরি। তার পর সময়ের আলো এই মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করে। অন্যরা করেছিল কিন্তু আমি কিছু পাইনি। সময়ের আলোর রিপোর্ট দেখে সাবেক মেয়র এমদা সাহেব আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিছে । এই টাকা নিয়ে আমি আবার ব্যবসায় ঘরে দাঁড়াবো।
ইউনুসের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ছাওয়ালের বাবা দ্বিতীয় বিয়া করছে। অন্যখানে আলাদা সংসারে থাকে। ঝাউতলা বস্তিতে পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়া অনেক কষ্ট করছি। মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করছি। আজ ছেলে পাখির ব্যবসা করে সুখের মুখ দেখইছি। আজ যে টাকা পাইলাম তা দিয়ে ব্যবসায় আয়-উন্নতি করবো।
ইউনুসের বোন বলেন, ভাইয়া তো প্রতিবন্ধী। তার কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। তাই সব ধরনের কাজে আমি তাকে সাহায্য করি। পাখির খাবার দেওয়া, বাজারে তুলে দেওয়া, বাজার থেকে আসলে নামানোসহ বিভিন্ন কাজ করে দিই। ভাইয়া শুধু বিক্রি করে। মাও তাকে কাজে সাহায্য করে। অনেক সময় মা নিজেই অন্য জায়গা থেকে পাখি কিনে আনে।পুঁজি বেশি থাকলে ব্যবসা আরও বাড়ত। তারপরও বলব, ওপর আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা ভালো আছি।
এএডি/