স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা তীরের চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে শহর ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও পদ্মার চরের বাসিন্দাদের এতদিন রাত কাটাতে হয়েছে কুপি, মোমবাতি, হারিকেন ও সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। দুর্গম এই চরাঞ্চলে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের কানাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দেন নেসকোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। বিদ্যুৎ সংযোগের পাশাপাশি পদ্মার ভাঙন রোধ ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন নিয়েও সভায় আলোচনা হয়।
মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার আগে নেসকো চেয়ারম্যান নেসকো ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে চর আষাড়িয়াদহের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। কানাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং কীভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে তাদের মতামত নেন। পরে পদ্মার ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সভায় শরীফ উদ্দীন বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে এসেও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। চরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে নেসকো দ্রুততম সময়ে এই দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চর আষাড়িয়াদহে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই তাদের দৈনন্দিন জীবন অনেকটা থেমে যায়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঘরের প্রয়োজনীয় কাজেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে শিশু, গৃহিণী ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেশি।
২০১৫ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা সীমিত পরিসরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু লোকসানের কারণে ২০২৪ সালের জুনে সেই ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চরবাসীর ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া, অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পর এখন বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ সরকারি পর্যায়েও এগিয়েছে। নেসকোর দরপত্র-সংক্রান্ত নথিতে চর আষাড়িয়াদহে বিদ্যুতায়নের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, রুট জরিপ, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে ৩৩ কেভি বা ১১ কেভি বিতরণ লাইন স্থাপনের বিষয়ও রয়েছে।
বিদ্যুতের পাশাপাশি চরবাসীর বড় আতঙ্ক পদ্মার নদীভাঙন। প্রতিবছর বর্ষা এলেই বসতভিটা, ফসলি জমি ও সড়ক হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে নদীভাঙনে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
চর আষাড়িয়াদহের ভাঙনপ্রবণ এলাকা রক্ষায় ২০২৬ সালের শুরুতে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন এলাকায় আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতিবছর জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকানোর পরিবর্তে নদীর গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
যোগাযোগব্যবস্থাও চরবাসীর দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। বর্ষায় অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কাদা ও ভাঙনের কারণে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে সমস্যা হয়। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং জরুরি রোগী পরিবহণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক সংস্কার এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. মিজানুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মো. জিয়াউল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, উপমহাব্যবস্থাপক (বাজেট ও পরিকল্পনা) মো. শাখাওয়াত হোসেন তালুকদারসহ নেসকোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডির কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।
চরবাসীর প্রত্যাশা, সভাটি যেন শুধু সমস্যা চিহ্নিত ও আশ্বাস দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তারা বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ও সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপ চান।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিদ্যুৎ, নিরাপদ বসতভিটা ও ভালো যোগাযোগব্যবস্থা তাদের কাছে আলাদা কোনো বিষয় নয়। এসবের সঙ্গে তাদের শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা ও জীবিকার ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই ৫৫ বছর পর বিদ্যুতের আলো পাওয়ার অপেক্ষার পাশাপাশি তারা চান, পদ্মার ভাঙন ও যোগাযোগের দুর্ভোগ থেকেও দ্রুত মুক্তি।
নেসকো চেয়ারম্যানের ঘোষণা ও সরেজমিন পরিদর্শনে চরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। এখন তাদের অপেক্ষা, দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবে কত দ্রুত পূরণ হয় এবং বিদ্যুতের আলো পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চর আষাড়িয়াদহের অন্যান্য নাগরিক সমস্যার সমাধানেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সময়ের আলো/জোই