চাঁদ দেখা যাওয়ার আগের বিকাল থেকেই ঘরে ঘরে শুরু হয় এক অন্য রকম উত্তেজনা। হাত ধরে মা-বাবার সঙ্গে দোকানে যাওয়া, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন জামা গায়ে মাপ নেওয়া আর মনে মনে ঈদের সকাল কল্পনা করা। শিশুদের কাছে ঈদের আনন্দের বড় অংশই নতুন পোশাক ঘিরে। বছরজুড়ে যত অপেক্ষা, তার অনেকটাই যেন পূরণ হয় ঈদের নতুন জামায়।
এ বছরের ঈদে শিশুদের পোশাকে এসেছে নতুন ট্রেন্ড। শুধু ঝলমলে ডিজাইন নয়, এবার গুরুত্ব পাচ্ছে আরাম, পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ছোটদের হাসি আর স্বাচ্ছন্দে চলাফেরাকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে এবারের ছোটদের ঈদ ফ্যাশন।
আরামই প্রথম শর্ত
সেইলরের সিনিয়র ডিজাইনার শায়লা শারমীন নূর বলেন, শিশুদের পোশাক শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হয় না। এমন হওয়া দরকার যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারে, দৌড়াতে পারে এবং আনন্দে নিজের মতো সময় কাটাতে পারে।
এই ভাবনা থেকেই সেইলর কিডস টিম এবারের নতুন কিডস কালেকশন নিয়ে এসেছে, যেখানে রং, আরাম এবং স্টাইলের সুন্দর সমন্বয় রয়েছে। একজন ডিজাইনার হিসেবে এই কালেকশনের প্রতিটি ধাপে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক। লক্ষ্য ছিল এমন পোশাক তৈরি করা, যা শিশুরা শুধু ঈদের দিন নয়, স্কুল, পারিবারিক আয়োজন কিংবা ছোটখাটো উৎসবেও স্বাচ্ছন্দ্যে পরতে পারে।
আমাদের এথেনিক ইন্সপায়রড কিডস ওয়ার তৈরি হয়েছে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া থেকে। শিশুদের আরামকে প্রাধান্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী মোটিফের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে হালকা ফেব্রিক, সহজ কাট এবং প্রাণবন্ত রঙের ব্যবহার। এই সেকশনে রয়েছে পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, টুপিস, কুর্তি সেট এবং টপ বোটাম সেট যা উৎসব কিংবা বিশেষ মুহূর্তে শিশুদের লুকে এনে দেয় আনন্দময় ও আকর্ষণীয় একটি আবহ।
শিশুদের প্রতিদিনের ব্যবহারকে আরও আরামদায়ক করতে তৈরি করা হয়েছে আমাদের ক্যাজুয়াল কিডস ওয়ার। এখানে রয়েছে ফ্রক, স্কার্ট টপস, টি-শার্ট, ক্যাজুয়াল টপস, ডেনিম, স্টর্স এবং বিভিন্ন ধরনের আরামদায়ক বটমস। স্মার্ট কাট, ট্রেন্ডি রং ও সফট ফেব্রিকের সমন্বয়ে এই পোশাকগুলো শিশুদের দৈনন্দিন মুহূর্তকে করে তোলে আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও স্টাইলিশ।
শিশুদের কোমল ত্বকের কথা মাথায় রেখে এই কালেকশনে ব্যবহার করা হয়েছে স্কিন-ফ্রেন্ডলি ফেব্রিক যেমন ব্লেনডেডি সিল্ক, কটন ব্লেন্ড, সফট পপলিন, লাইটওয়েট ডেনিম ও ডব্বি কটন।
মেয়েশিশুদের পোশাকে ঐতিহ্য ও ফিউশন
মেয়েশিশুদের জন্য ফ্রক, গাউন ও লেহেঙ্গা সবসময়ের মতোই রয়েছে। তবে এবার ঐতিহ্যবাহী জামদানি মোটিফ ও ব্লক প্রিন্টের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। ছোট কুর্তির সঙ্গে পালাজো বা ঘেরওয়ালা স্কার্টের ফিউশন সেট বেশ জনপ্রিয়।
রঙের ক্ষেত্রেও এসেছে বৈচিত্র্য।
প্যাস্টেল রং যেমন ল্যাভেন্ডার, মিন্ট গ্রিন, বেবি পিংকের পাশাপাশি উজ্জ্বল হলুদ ও ফিরোজা রঙের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। হালকা এমব্রয়ডারি, ফুলের কাজ ও থ্রেড ডিটেইলিং পোশাকে এনে দিচ্ছে উৎসবের আমেজ। তবে ভারী কাজ কম রাখা হচ্ছে, যাতে শিশুরা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলাধুলা করতে পারে।
ছেলেশিশুদের পোশাকে বৈচিত্র্য
ছেলেদের ক্ষেত্রে পাঞ্জাবি-পায়জামা ঈদের ক্লাসিক পোশাক। তবে এ বছর প্যাস্টেল ও আর্থি টোনে পাঞ্জাবির চাহিদা বাড়ছে। হালকা এমব্রয়ডারি, কনট্রাস্ট কলার ও কাফ ডিজাইন বেশ জনপ্রিয়। সঙ্গে স্লিম ফিট পায়জামা বা চাইনিজ কাট প্যান্ট যোগ হচ্ছে নতুনত্ব হিসেবে। এ ছাড়া ছোটদের জন্য কোট-স্টাইল পাঞ্জাবি ও ওয়েস্টকোট সেট বেশ জনপ্রিয়। পরিবারের সবাই একই রং বা থিমে পোশাক পরার প্রবণতাও বেড়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কো-অর্ডিনেটেড লুক’। এতে পারিবারিক ছবিতে যেমন সুন্দর দেখায়, তেমনি উৎসবের আনন্দও আরও বাড়ে।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন
এবারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো টেকসই ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহ। অনেক প্রতিষ্ঠান রিসাইকেলড ফেব্রিক বা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করছে। অভিভাবকরাও এমন পোশাক খুঁজছেন, যা একাধিকবার পরা যাবে এবং অন্য সময়েও ব্যবহারযোগ্য। এক দিনের উৎসবের জন্য আলমারিতে পড়ে থাকবে এমন পোশাকের বদলে ব্যবহারিক ডিজাইনের চাহিদা বাড়ছে।
রঙে ও ডিজাইনে গল্প
এ বছরের ট্রেন্ডে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় পোশাকে গল্প বা থিমের ব্যবহার। কার্টুন প্রিন্টের বদলে এখন ছোট মোটিফ, প্রাকৃতিক বা জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহার হচ্ছে। এতে পোশাক যেমন নান্দনিক হয়, তেমনি সাংস্কৃতিক সংযোগও তৈরি করে।
নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক দিক
শিশুদের পোশাকে ছোট বোতাম, ধারালো অ্যাকসেসরিজ বা ভারী অলংকার এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ডিজাইনার এখন ‘সেফ ডিজাইন’ ধারণা অনুসরণ করছেন। ইলাস্টিক কোমরবন্ধ, সহজে পরা-খোলা যায় এমন নকশা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে।
ঈদ মানে আনন্দ, আর সেই আনন্দের বড় অংশজুড়ে থাকে নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস। শিশুদের ফ্যাশনে এখন আর কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য নয় আরাম, নিরাপত্তা, সংস্কৃতির ছোঁয়া ও পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়। ঈদের সকালে যখন নতুন জামা পরে শিশুরা হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়, তখন সেই হাসিই হয়ে ওঠে উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর রং। নতুন পোশাক শুধু সাজ নয়, তাদের আনন্দ আর স্বস্তিরও সঙ্গী।
সময়ের আলো/এআর