হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলবে : ইরান

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের অনুরোধে ইরান

2026-03-10T10:03:51+00:00
2026-03-10T10:03:51+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলবে : ইরান
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ১০:০৩ এএম 
তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজ। সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের অনুরোধে ইরান আশ্বাস দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জন্য তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহন নৌপথ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ইরান এতে সম্মতি জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে যেন তাদের জানানো হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত দেশটি এ অনুরোধ করেছে। ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল বহনকারী একটি জাহাজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে আরও চারটি জাহাজ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ২০৫ টন তেল নিয়ে বন্দরে পৌঁছাবে। পাশাপাশি এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে।

একজন কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার চুক্তির বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে।

স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা থাকে। তবে বর্তমানে সরকার দৈনিক প্রায় ৯ হাজার টন সরবরাহ করছে। এই সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আসন্ন পাঁচটি চালানে আসা মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি দিয়ে প্রায় ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

সোমবার সকালে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ সাদেক চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজ পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সোমবার রাতেও আরও একটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

ভারত ও চীনের সহায়তার ইঙ্গিত

বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীন ও ভারত সহায়তা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশ দুটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তিনি বলেন, শুধু ভারত ও চীন নয়, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ফলে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, জ্বালানি সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশকে জ্বালানি সহায়তা দিতেও চীন আগ্রহী।

অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির সুযোগ দিচ্ছে ভারত 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের সরবরাহ ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন ডিজেল আমদানির সুযোগ এখনও রয়েছে।

বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য অতিরিক্ত এই সরবরাহ মার্চের শেষ সপ্তাহ ও এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ মার্চের শুরুতে নির্ধারিত দুটি ডিজেল চালান নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায়নি।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশে তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। বিপিসি এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে।

আরও আসছে চারটি ট্যাংকার

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে ‘শিউ চি’ নামের একটি ট্যাংকার সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে। শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও চারটি ডিজেলবাহী ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছাবে।

‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের একটি ট্যাংকার প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে সোমবার রাতে বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। ‘এসপিটি থেমিস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বৃহস্পতিবার প্রায় ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল নিয়ে পৌঁছাবে।

এছাড়া ‘র‍্যাফেলস সামুরাই’ এবং ‘চাং হাং হং তু’ নামের আরও দুটি জাহাজ শনিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন করে ডিজেল থাকবে।

চারটি ট্যাংকারের স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছাবে।


জরুরি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ 

সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে বিকল্প উৎস থেকে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করা হবে। এ জন্য উত্তর আমেরিকার কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

রোববার জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এপ্রিল মাসে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সব সম্ভাব্য বিকল্প উৎস বিবেচনায় নিচ্ছে।

তিনি জানান, মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এড়াতে ডিপিএম পদ্ধতিতে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় সময় লাগতে পারে। তাই আগেভাগেই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওমান ও কুয়েত—এই আটটি দেশ থেকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে।

তবে কর্মকর্তারা জানান, দেশের চাহিদার একটি বড় অংশের পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ফলে এসব জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।

আমদানিতে বিঘ্নের কারণ 

৭ মার্চ প্রস্তুত করা বিপিসির এক প্রতিবেদনে—যা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে—জানানো হয়, মার্চ মাসে ২ লাখ ৯৩ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেলের চালান স্থগিত বা বাতিল হওয়ায় সরবরাহ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, নিকটপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি থাকলেও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ভিটল এশিয়া মার্চের জন্য নির্ধারিত একটি অকটেন চালান বাতিল করেছে।

৭ মার্চ পর্যন্ত বিপিসির তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এছাড়া ২৩ হাজার টন অকটেন রয়েছে, যা প্রায় ২৫ দিন চলবে এবং ১৫ হাজার টন পেট্রোল রয়েছে, যা প্রায় ১৫ দিনের জন্য যথেষ্ট।

এছাড়া ৬৭ হাজার টন ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ৪৯ দিন চলতে পারে। জেট এ–১ এভিয়েশন ফুয়েলের মজুত প্রায় ৬০ হাজার টন, যা প্রায় ৪৯ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম।

কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা 

জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এছাড়া জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, বাজারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।


/ইউএমএইচ


  বিষয়:   হরমুজ প্রণালি  তেলবাহী ট্যাংকার  ইরান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: