নেপালের রাজনীতিতে পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে। গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত ভোটের গণনা এখনও চলমান থাকলেও প্রাথমিক ফলাফলেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী হেভিওয়েট নেতাদের অনেকেই যেখানে পিছিয়ে পড়ছেন, সেখানে সামনে আসছে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সুপার মেজরিটি’ নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। যা দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নেপাল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচনে (এফপিটিপি) ১৬৫টি আসনের মধ্যে বালেন্দ্র শাহর আরএসপি এরই মধ্যে ১২৫ আসনে জয়লাভ করেছে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে ১১০ আসনের মধ্যে দলটি অন্তত ৫৮ আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ফলাফল বজায় থাকলে নেপালের ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে আরএসপি মাত্র একটি আসন দূরে থাকবে। নেপালের দ্বৈত নির্বাচন ব্যবস্থায় যেখানে জোট সরকারই নিয়ম ছিল, সেখানে একক দলের এমন জয় ইতিহাস সৃষ্টি করছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিশাল পরাজয়। নিজের নির্বাচনি এলাকায় বালেন্দ্র শাহর কাছে বিপুল ব্যবধানে হেরেছেন তিনি। ৭৪ বছর বয়সি ওলি ও তার সরকারের বিরুদ্ধে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও বেকারত্বের প্রতিবাদে যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, এই ফলাফল তারই ফসল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বালেন্দ্র শাহ যদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তবে তিনি হবেন নেপালের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম সরকারপ্রধান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিশ রাজ মুলমি বলেন, ‘নেপালের রাজনীতির পেন্ডুলাম এখন পুরোপুরি তরুণ প্রজন্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।’
ফলাফল ঘোষণায় দেরি কেন?
নেপালি নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে সব ভোট গণনা শেষ হবে। তবে চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ফলাফলের জন্য আরও অন্তত চারদিন অপেক্ষা করতে হবে।
নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে ব্যালট বক্স সংগ্রহ করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে হেলিকপ্টারে করে বা পায়ে হেঁটে কয়েক দিন ধরে ব্যালট বক্স কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়।
এ ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে হাতে কলমে ভোট গণনার কারণেও প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়। যদিও অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের ফলাফলের গতি বেশ দ্রুত। ২০২২ সালের নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল।
ভোটগ্রহণ ও অংশগ্রহণ : নেপালে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। নেপালের পার্লামেন্টের মোট ২৭৫ আসন রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫ আসনের নেতৃত্ব এফপিটিপি এবং ১১০ আসন পিআর পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়। গত ৫ মার্চের নির্বাচনে মোট ৬ হাজার ৫৪১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এদের মধ্যে ৩ হাজার ৪০৬ জন সরাসরি নির্বাচিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাদের মধ্যে এক হাজারের বেশি প্রার্থীর বয়স ৪০ বছরের কম। আর ৩ হাজার ১৩৫ জন প্রার্থী পিআর ব্যবস্থার অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কোন দল কত আসন পেল?
বালেন্দ্র শাহর আরএসপি এরই মধ্যে ১২৫ আসনে জয় নিশ্চিত করেছে। নেপালের প্রাচীনতম ও সদস্যপদে বৃহত্তম দল নেপালি কংগ্রেস সরাসরি ভোটে মাত্র ১৮টি আসন পেয়েছে। আরএসপির পর তারা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। ওলির দল নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ইউএমএল গত নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন জিতেছিল। কিন্তু তারা এবার মাত্র আটটি আসন জিতেছে।
সময়ের আলো/আরবিএন