আমেরিকা মহাদেশজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এক নতুন প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, পুরো অঞ্চলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পশ্চাৎপদ হয়ে যাচ্ছে, আর এই পতন সবচেয়ে তীব্রভাবে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। খবর আলজাজিরার।
মঙ্গলবার ইন্টার আমেরিকান প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (আইএপিএ) তাদের সর্বশেষ প্রেস ফ্রিডম সূচক প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০২০ সালে এই প্রতিবেদন শুরু হওয়ার পর গত বছরই ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে নিম্নমুখী সময়।
গবেষকদের মতে, আমেরিকা মহাদেশে অবাধ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ‘নাটকীয় অবনতি’ ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চলটির সাংবাদিকতার জন্য এটি সবচেয়ে খারাপ বছরগুলোর একটি। মেক্সিকো, হন্ডুরাস, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, কলম্বিয়া, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশে সাংবাদিক হত্যা, ইচ্ছামতো গ্রেফতার, নির্বাসনে যেতে বাধ্য হওয়া এবং অপরাধীদের দায়মুক্তি ব্যাপকভাবে দেখা গেছে।’
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ কেবল এক ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শে সীমাবদ্ধ নয়। ডানপন্থি কিংবা বামপন্থি সরকার- উভয় ধরনের দেশেই এই সীমাবদ্ধতা বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে ‘উদ্বেগজনক পতনের’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিম গোলার্ধের ২৩টি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ স্থান থেকে নেমে ১১ তম স্থানে চলে গেছে। এর অর্থ, সেখানে সাংবাদিকদের কাজ করার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত বছর ক্ষমতায় ফিরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার কিছু পরিবর্তন এ পরিস্থিতির প্রধান কারণগুলোর একটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা এখনও সংবিধান ও আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত। কিন্তু গত বছরের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে সেই সুরক্ষার কিছু অংশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।’
প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে ‘বিনষ্ট’ করার পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের জন্য সরকারি অর্থায়ন কমানো এবং সরকারি অর্থায়নে চলা সম্প্রচারমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকা বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মোট ১৭০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সংঘর্ষ বা যোগাযোগের ঘটনাগুলোও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, নিকারাগুয়া ও ভেনেজুয়েলা এখনও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই’ এমন দেশের তালিকায় রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশটিতে ৪০০টির বেশি রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ২৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। ১০০ পয়েন্টের স্কেলে দেশটির প্রেস স্বাধীনতার স্কোর মাত্র ৭ দশমিক ০২। ২৩টি দেশের তালিকায় এটি সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে।
সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এল সালভাদরের অবস্থানও আরও নিচে নেমে গেছে। এখন প্রেস স্বাধীনতার তালিকায় দেশটি ২১ তম স্থানে, নিকারাগুয়া ও ভেনিজুয়েলার ঠিক ওপরে। এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে এল সালভাদরের সাংবাদিক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস অব এল সালভাদরের সভাপতি সের্গিও আরাউজ দেশটির প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে সরকারের অধীনে ‘ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের’ অভিযোগ তুলেছেন।
আরাউজ বলেন, গত এক বছরে সরকারি হয়রানির কারণে ৫০ জন সালভাদরীয় সাংবাদিক দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যখন নির্বাহী বিভাগ প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করে এবং কার্যকর আইনি নজরদারি থাকে না, তখন কোনো পরিণতির ঝুঁকি ছাড়া পূর্ণভাবে সাংবাদিকতা করার কোনো সুযোগ থাকে না।’
প্রেস ফ্রিডম সূচকে এল সালভাদরকে ‘উচ্চমাত্রার বিধিনিষেধ’ শ্রেণিতে রাখা আটটি দেশের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ইকুয়েডর, বলিভিয়া, হন্ডুরাস, পেরু, মেক্সিকো, হাইতি ও কিউবাও। অন্যদিকে ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, চিলি, কানাডা ও ব্রাজিলকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ