মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এক মুহূর্তের দৃশ্য যেন অনেক দিনের অপেক্ষার গল্প। সালমান আগার বলটাকে উড়িয়ে সীমানার বাইরে পাঠানোর পরই হেলমেট খুলে রাখা তানজিদ হাসান দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। চোখেমুখে তখন স্বস্তি আর তৃপ্তির ছাপ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বহুদিন ধরে যার অপেক্ষা ছিল, অবশেষে সেই স্বপ্নপূরণ। শতকের মাইলফলক ছুঁয়ে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন তিনি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অপর প্রান্ত থেকে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন সতীর্থ লিটন দাস।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই তানজিদ হাসানকে ঘিরে ছিল বড় প্রত্যাশা। প্রতিভার ঝলক তিনি দেখিয়েছেন অনেকবারই। আক্রমণাত্মক ব্যাটিং আর বাউন্ডারি মারার ক্ষমতায় নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন। কিন্তু বড় ইনিংসের সেই কাক্সিক্ষত মুহূর্ত যেন বারবার হাতছাড়া হচ্ছিল। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ৩০ ম্যাচে তার ঝুলিতে ছিল ৫টি অর্ধশতক, আর টি-টোয়েন্টিতে ৪৫ ম্যাচে ছিল ১১টি ফিফটি। তবু তিন অঙ্কের সেই জাদুকরী সংখ্যা ছোঁয়া হচ্ছিল না কিছুতেই। অবশেষে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে মিরপুরে ফুরাল সেই অপেক্ষা।
এই সিরিজের আগেও দলে তার জায়গা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে একাদশেই জায়গা হয়নি তানজিদের। ওপেনিংয়ে লিটন দাসের সঙ্গে দলের প্রথম পছন্দ ছিলেন সৌম্য সরকার। সেই জুটিও ভালো শুরু এনে দিয়েছিল, এমনকি ৯১ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরাও হয়েছিলেন। তবু ঘরোয়া ক্রিকেট এবং প্রস্তুতি ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তান সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে আবার সুযোগ দেওয়া হয় তানজিদকে।
সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচেই ১১৪ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৪২ বলে ৬৯ রানের দারুণ ইনিংস খেলেছিলেন। মনে হয়েছিল ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই আবার ধাক্কা- ৭ বল খেলে মাত্র ১ রান করে ফিরতে হয় প্যাভিলিয়নে। ফলে তৃতীয় ম্যাচে ব্যর্থ হলে তাকে দলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক ছিল। তবে মিরপুরে ব্যাট হাতে নেমে তানজিদ যেন শুরু থেকেই বুঝিয়ে দিলেন, এবার আর ভুল করতে চান না।
টস হেরে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের ইনিংসের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এই ওপেনার। পাওয়ার প্লেতে তার ব্যাটে ভর করেই এগিয়েছে দল। প্রথম ১০ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান যখন ৫০, তানজিদ তখন ৩৩ বলে অপরাজিত ৩০ রানে। এই সময়ের মধ্যেই দুই ছক্কা মেরে একটি রেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি। লিটন দাসকে ছাড়িয়ে ওয়ানডেতে পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ড এখন তার দখলে।
এর আগে অনেকবারই তানজিদ শুরুটা ভালো করেছিলেন, কিন্তু ইনিংস বড় করতে পারেননি। সেই সমালোচনাও ছিল তার সঙ্গী। তবে এবার ভিন্ন ছবি দেখা গেল। ধৈর্য আর আক্রমণের মিশেলে ইনিংস গড়তে থাকেন তিনি। ৪৭ বলে তুলে নেন অর্ধশতক, আর শতকে পৌঁছান ৯৮ বলে।
এই ইনিংসে তার ব্যাট থেকে আসে ৯টি চার ও ৭টি ছক্কা। এতেই তৈরি হয় নতুন রেকর্ড। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এখন তার দখলে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার কীর্তিও গড়েন তানজিদ।
তবে শতক ছোঁয়ার পর ইনিংসটি খুব বেশি বড় করতে পারেননি। তখন থেকেই শরীরী ভাষায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল। ঠিকমতো হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ১০৭ বলে ১০৭ রান করেই থামে লড়াকু ইনিংসটি। আউট হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন এই তরুণ ওপেনার। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে পাওয়া এই শতক শুধু তার ব্যক্তিগত মাইলফলকই নয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও হয়ে থাকল তানজিদ হাসানের জন্য।
সময়ের আলো/কেএইচও