জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। ঈদের পর এই কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলছেন দলের শীর্ষ নেতারা। এর অংশ হিসেবে দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতা সংসদ সদস্য এবং বেশ কজন সিনিয়র নেতা মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় তারা এখন দলীয় কাজে তেমন সময় দিতে পারছেন না। আর যারা মন্ত্রী, এমপি হতে পারেননি তারা এখন কিছুটা হতাশ।
এ ছাড়া দলীয় কর্মসূচিও আগের মতো নেই। আগে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হতো, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হতো এবং বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন হতো। নির্বাচনের পর আর সেভাবে হচ্ছে না। অন্যবারের মতো এবার বিএনপি কোনো ইফতার মাহফিলও করেনি। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতাদের আসা-যাওয়া কেন্দ্র করে এখানে কিছুটা কর্মচঞ্চলতা থাকলেও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় যেন নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে।
একসময় নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই কার্যালয়ে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা গেলেও এখন সেখানে নীরবতা বিরাজ করছে। দলীয় কর্মসূচি না থাকায় সাধারণ নেতাকর্মীরাও এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তবে এ অবস্থা বেশি দিন থাকবে না বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় নেতারা সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন।
তাদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা। একই পরিস্থিতি মূল দল বিএনপিতেও।
সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। তাই স্থায়ী কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে নির্বাহী কমিটিতে বিশেষ সম্পাদক পদে স্থান দেওয়া হয়েছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, শীর্ষ নেতাদের সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের স্থবিরতার কারণে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের চিন্তা রয়েছে দলটির। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস এবং শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা কম। আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর থেকেই এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বাস্তবায়ন করতে চান। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের স্থলে নতুন নেতৃত্ব আনা হতে পারে। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তারা দলীয় কার্যক্রমে সেভাবে সময় দিতে পারছেন না। তাদের বদলে অন্য নেতৃত্ব থাকলে দল ও সরকার উভয়ই উপকৃত হবে।
অন্যদিকে নির্বাচনের পর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদে যেতে আগ্রহীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। পদপ্রত্যাশীরা ইতিমধ্যে লবিংও শুরু করেছেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অনেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথাও তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দলের সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংগঠনকে গতিশীল করার বিকল্প নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, আপাতত মূল দলের পুনর্গঠন বা জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা নেই। তবে অঙ্গসংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে গেছেন। এখন অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্বিন্যাসের সময় এসেছে। নীতিনির্ধারণী মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। শিগগিরই কয়েকটি অঙ্গসংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শিগগিরই দলীয় কার্যক্রম গতিশীল করা হবে।