এক রিপোর্টারের ডায়েরি লাল কার্পেটের আড়ালে যুদ্ধের ছায়া

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের অস্থির সময়ের ভেতরেই বসেছিল বিশ্বের সবচেয়ে ঝলমলে চলচ্চিত্র আয়োজন। অস্কারের সেই রাতকে কাছ থেকে দেখেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্যারোলিন ফ্রস্ট,

2026-03-19T05:16:12+00:00
2026-03-19T05:16:12+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
এক রিপোর্টারের ডায়েরি লাল কার্পেটের আড়ালে যুদ্ধের ছায়া
রিপোর্টার, ডায়েরি, লাল, কার্পেট, যুদ্ধ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ৫:১৬ এএম 
হলিউডে ডলবি থিয়েটারে ৯৮তম অস্কার আসরে লাল গালিচায় নিক জোনাস ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধের অস্থির সময়ের ভেতরেই বসেছিল বিশ্বের সবচেয়ে ঝলমলে চলচ্চিত্র আয়োজন। অস্কারের সেই রাতকে কাছ থেকে দেখেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্যারোলিন ফ্রস্ট, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য হলিউড রিপোর্টার এ কাজ করছেন এবং হলিউড, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংযোগ নিয়ে নিয়মিত লিখছেন। উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উত্তেজনা, মঞ্চের বক্তব্য আর নীরব প্রতিবাদের মুহূর্তগুলো তিনি তুলে ধরেছেন নিজের দিনলিপিতে। সেই রিপোর্টারের চোখে দেখা অস্কারের রাত- সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

অস্কারের রাত সাধারণত সিনেমার উৎসব। কিন্তু এবার মনে হলো, এই মঞ্চে শুধু চলচ্চিত্র নয়- বিশ্ব রাজনীতিও উপস্থিত। যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, গাজা- সবকিছু যেন নীরবে ঢুকে পড়েছে আলো ঝলমলে এই অনুষ্ঠানে। কেউ সরাসরি বলেছে, কেউ বুকের ওপর ছোট্ট একটি ব্যাজ পরে চুপচাপ বার্তা দিয়েছে। পুরো পরিবেশটা এমন ছিল, যেন আমরা কোনো পুরস্কার বিতরণী নয়, বরং সময়ের এক অস্বস্তিকর মুহূর্তকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

ডলবি থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রথমেই যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ঠিক আনন্দের ছিল না। চারদিকে আলো, ক্যামেরার ঝলকানি, হাসিমুখ- সবই ছিল, কিন্তু তার ভেতরে কোথাও একটা চাপা টান। রেড কার্পেটে তারকারা হাঁটছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের পোশাকের চেয়েও বেশি চোখে পড়ছিল ছোট ছোট ব্যাজ। কারও বুকের ওপর লেখা ‘আইস আউট’, কারও ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। শব্দগুলো উচ্চারণ করা হচ্ছিল না, কিন্তু উপস্থিত সবার কাছে যেন বার্তাটা স্পষ্ট ছিল।

একজন অভিনেতাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই ব্যাজ কেন? তিনি একটু থেমে মুচকি হেসে বললেন, ‘সব কথা মাইকে বলতে হয় না।’ কথাটা শুনে মনে হলো, এই পুরো আয়োজনটাই যেন সে-ই না বলা কথার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে যে পৃথিবী উত্তাল, তার প্রতিফলন ভেতরে ঢুকে পড়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না।

হলঘরে ঢোকার পর সেই অনুভূতিটা আরও স্পষ্ট হলো। উপস্থাপক কনান ও’ব্রায়েন অনুষ্ঠানটাকে হালকা রাখার চেষ্টা করছিলেন, রসিকতা করছিলেন, কিন্তু মাঝেমধ্যে তার কথাতেও রাজনীতির ছায়া এসে যাচ্ছিল। হাসি হচ্ছিল, করতালিও হচ্ছিল, কিন্তু তাতে একটা অদ্ভুত সংযম ছিল—যেন সবাই একটু হিসেব করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। 

মঞ্চে যখন হাভিয়ের বারদেম উঠলেন, তখন পরিবেশটা হঠাৎ বদলে গেল। তিনি খুব জোরে নয়, বরং শান্ত গলায় বললেন- ‘না টু ওয়ার ফ্রি প্যালেস্টাইন।’ শব্দগুলো ছোট ছিল, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি বড়। পুরো হলঘর করতালিতে ভরে উঠল। আমি তখন নোট নিচ্ছিলাম, কিন্তু হাত থেমে গেল। মনে হচ্ছিল, এটা শুধু একটি বক্তব্য নয়- এটা সময়ের একটা মুহূর্ত, যেটা পরে ফিরে দেখলে বোঝা যাবে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

এরপর আরও অনেকে কথা বললেন। কেউ সরাসরি যুদ্ধের কথা বলেননি, কিন্তু ইঙ্গিতগুলো স্পষ্ট ছিল। কেউ বললেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা, কেউ বললেন আমরা পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। একটা জিনিস বারবার চোখে পড়ছিল- সবাই কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু পুরোটা বলছেন না। যেন একটা অদৃশ্য সীমারেখা আছে, যেটা অতিক্রম করলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে।

বাইরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেই অস্বস্তিকে আরও বাস্তব করে তুলছিল। চারপাশে কঠোর নজরদারি, পুলিশ, চেকপয়েন্ট; সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, এটা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং কোনো উচ্চঝুঁকির এলাকা। সহকর্মীদের একজন মজা করে বলল, ‘এখানে ঢুকতে পারাটাই যেন একটা পুরস্কার।’ হাসলাম, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, এই নিরাপত্তার পেছনে যে ভয় কাজ করছে, সেটা খুবই বাস্তব।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার দেওয়া চলছিল। ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ একের পর এক পুরস্কার জিতছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, সেই জয়গুলো যেন মূল গল্প ছিল না। কে কী বলছে, কে কী পরছে, কে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে- সেগুলোই হয়ে উঠছিল আসল আলোচনার বিষয়। মনে হচ্ছিল, সিনেমা এখানে একটা পটভূমি মাত্র; আসল গল্পটা অন্য কোথাও।

শেষে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার সময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হলো, অস্কার শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই রাতের কথাগুলো শেষ হয়নি। কিছু কথা বলা হয়েছে, কিছু কথা বলা হয়নি- আর সেই না-বলা কথাগুলোই হয়তো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করছে। মনে হচ্ছিল, আমি কোনো পুরস্কার বিতরণী কভার করিনি; আমি কভার করেছি একটা সময়কে, যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নীরবতা- সবকিছুই রাজনৈতিক।

সময়ের আলো/আআ



Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: